২৬ জানুয়ারি কেন স্বাধীনতা দিবস হল না? ‘পূর্ণ স্বরাজ’-এর শপথ থেকে প্রজাতন্ত্র— ইতিহাসের মোড় ঘোরানো গল্প

২৬ জানুয়ারি স্বাধীনতা দিবস হতে পারত। ১৯৩০-এর লাহোর অধিবেশনে পূর্ণ স্বরাজের শপথ নেওয়া হয়। তবে দেশভাগ-পরিস্থিতিতে ১৫ আগস্ট স্বাধীনতা দিবস হয়, ২৬ জানুয়ারি হয় প্রজাতন্ত্র দিবস।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

২৬ জানুয়ারি মানেই প্রজাতন্ত্র দিবসের গৌরব, কুচকাওয়াজ, জাতীয় পতাকার প্রতি শ্রদ্ধা আর সংবিধানের জয়গান। কিন্তু জানেন কি— ভারতের ইতিহাসে এমন একটি সময় ছিল, যখন ২৬ জানুয়ারিকেই স্বাধীনতা দিবস ঘোষণা করার বাস্তব সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল? স্বাধীনতা আন্দোলনের এক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত, দেশের ভাগাভাগির নির্মম বাস্তবতা এবং সংবিধান কার্যকর হওয়ার ঐতিহাসিক মুহূর্ত— সব মিলিয়ে ২৬ জানুয়ারি পেয়েছে এক অনন্য পরিচয়। আর সেখানেই লুকিয়ে রয়েছে প্রশ্নের উত্তর— কেন ২৬ জানুয়ারি স্বাধীনতা দিবস হল না।

পূর্ণ স্বরাজের ঘোষণা: ২৬ জানুয়ারির ঐতিহাসিক ভিত্তি

২৬ জানুয়ারিকে স্বাধীনতার প্রতীক করে তোলার সূত্র মিলবে ১৯৩০ সালের লাহোর কংগ্রেস অধিবেশনে। ওই অধিবেশনেই কংগ্রেস নেতৃত্ব ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে স্পষ্ট ভাষায় তুলে ধরেছিল— ‘পূর্ণ স্বরাজ’, অর্থাৎ সম্পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি।

Shamim Ahamed Ads

এই সিদ্ধান্তের পেছনে ছিলেন তৎকালীন কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্ব। মহাত্মা গান্ধী সহ একাধিক নেতা সেদিন স্বাধীনতার দাবিকে আর “ডোমিনিয়ন স্ট্যাটাস” বা সীমিত স্বায়ত্তশাসনের মধ্যে আটকে রাখতে চাননি। ফলে পূর্ণ স্বাধীনতা তখন হয়ে উঠেছিল জাতির রাজনৈতিক লক্ষ্য।

স্বাধীনতার শপথ গ্রহণ— দিনটিকে প্রতীকে বদলে দিয়েছিল

লাহোর অধিবেশন শুধু প্রস্তাব পাশ করেই থেমে থাকেনি। সেই সময় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল— ২৬ জানুয়ারি দিনটিকে ‘স্বাধীনতা দিবস’ হিসেবে পালন করা হবে এবং দেশজুড়ে মানুষ স্বাধীনতার শপথ নেবেন

এই কারণেই ২৬ জানুয়ারি স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে হয়ে ওঠে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি দিন। স্বাধীনতার আগেই এই দিনটি ছিল জাতীয় আকাঙ্ক্ষার প্রতীক— যেখানে ভারতবাসীর কাছে “স্বাধীনতা” ছিল শপথ, সংগ্রাম আর আত্মমর্যাদার নাম।

কিন্তু স্বাধীনতার দিন এল ভিন্ন বাস্তবতায়— দেশভাগের ক্ষত নিয়ে

ভারতের স্বাধীনতা যে শুধু আনন্দ ছিল না, তার সঙ্গে জড়িয়ে ছিল দেশভাগের মর্মান্তিক বেদনা। ইতিহাসের সেই অধ্যায় এখনও কোটি মানুষের স্মৃতিতে রক্তক্ষরণ ঘটায়।

১৯৪৭ সালে পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায় যে পাকিস্তান স্বাধীন হয় ১৪ আগস্ট, এবং তার পরেই ১৫ আগস্ট মধ্যরাতে ভারত স্বাধীন হয়। সেই সময় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতা অনুযায়ী ১৫ আগস্টকেই স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক দিন হিসেবে গ্রহণ করা হয়।

ফলে, ২৬ জানুয়ারির ঐতিহাসিক গুরুত্ব থাকা সত্ত্বেও— স্বাধীনতার সরকারি ঘোষণা হয় ১৫ আগস্ট, আর সেটাই স্থায়ীভাবে ভারতের স্বাধীনতা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

তবুও ২৬ জানুয়ারি হারায়নি— পেয়েছে নতুন পরিচয়

যদিও ২৬ জানুয়ারি স্বাধীনতা দিবস হয়নি, দিনটি ইতিহাসে ‘ছুটির দিন’ হয়ে হারিয়েও যায়নি। বরং স্বাধীনতার পর ভারত যখন নতুন রাষ্ট্র কাঠামো গড়ার পথে এগোচ্ছে— তখন আবার সামনে আসে ২৬ জানুয়ারি।

ভারতের সংবিধান প্রণয়ন সম্পূর্ণ হওয়ার পর ১৯৪৯ সালের ২৬ নভেম্বর সংবিধান গৃহীত হয়। কিন্তু সেদিন থেকেই তা কার্যকর করা হয়নি।

সংবিধান কার্যকর হয় ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি। এই নির্দিষ্ট তারিখটি বেছে নেওয়ার পিছনে একটা বড় আবেগ কাজ করেছিল— পূর্ণ স্বরাজের দিন হিসেবে ২৬ জানুয়ারির ঐতিহাসিক স্মৃতিকে সম্মান জানানো।

আর সেই থেকেই—

  • ২৬ জানুয়ারি: সংবিধান কার্যকর হওয়ার দিন

  • ২৬ জানুয়ারি: ভারতীয় প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দিন

  • ২৬ জানুয়ারি: প্রজাতন্ত্র দিবস

স্বাধীনতার শপথ থেকে প্রজাতন্ত্র— ২৬ জানুয়ারির আসল বার্তা

এক অর্থে ২৬ জানুয়ারি ভারতের ইতিহাসে দুই যুগকে যুক্ত করে—
একদিকে স্বাধীনতার শপথ ও আন্দোলনের প্রতীক, অন্যদিকে স্বাধীন দেশের সংবিধান ও প্রজাতন্ত্রের আনুষ্ঠানিক জন্মদিন।

তাই ২৬ জানুয়ারি স্বাধীনতা দিবস না হলেও, ভারতের জাতীয় জীবনে দিনটির গুরুত্ব কম নয়— বরং এটি দেশের গণতান্ত্রিক আত্মপরিচয়ের সবচেয়ে বড় উৎসব।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহুর্তে। আমাদের ফলো করুন
Google News Google News

সদ্য প্রকাশিত