সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট বলেছিল— ডিএ সরকারি কর্মচারীদের আইনগত অধিকার। ৩১ মার্চের মধ্যে বকেয়া মেটানোর নির্দেশও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই সময়সীমা যত ঘনিয়ে আসছে, ততই পশ্চিমবঙ্গের সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে ক্ষোভ ও বিভ্রান্তি বাড়ছে। WBIFMS পোর্টালে নিজেদের প্রাপ্য হিসাব দেখতে গিয়ে বহু কর্মচারী অভিযোগ তুলছেন— প্রকৃত টাকার অঙ্ক কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আর এই অভিযোগই এখন নতুন করে রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্কের কেন্দ্রে।
গত ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ সুপ্রিম কোর্টের ডিভিশন বেঞ্চের রায়ে স্পষ্ট করে বলা হয়, মহার্ঘ ভাতা (DA) কোনো অনুগ্রহ নয়, এটি কর্মচারীদের ‘Legally Enforceable Right’। সেই অনুযায়ী, রাজ্য সরকারকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বকেয়া মেটানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে অর্থ দপ্তরের সাম্প্রতিক মেমো ঘিরে উঠছে একাধিক প্রশ্ন।


ইউনিটি ফোরামের আহ্বায়ক দেবপ্রসাদ হালদারের অভিযোগ, সরকারি হিসাবেই বড়সড় গরমিল রয়েছে। কর্মচারীদের হাতে আসা হিসাব খতিয়ে দেখে দেখা যাচ্ছে, প্রকৃত পাওনার তুলনায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কম টাকা ধরা হয়েছে। এখানেই তৈরি হয়েছে মূল বিতর্ক।
বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে ডিএ-র শতাংশ নির্ধারণ। কর্মচারী সংগঠনগুলির দাবি, ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এআইসিপিআই (AICPI) সূচক অনুযায়ী ১৬৪% হারে ডিএ পাওনা হওয়া উচিত। কিন্তু অভিযোগ, রাজ্য সরকার সেই হার কমিয়ে ১৪০% থেকে ১৪৫%-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখছে। ফলে কর্মচারীদের একটি বড় অংশ মনে করছেন, তারা প্রকৃত পাওনার অর্ধেকের কাছাকাছি পাচ্ছেন।
আরও বড় প্রশ্ন উঠেছে বৈষম্য নিয়ে। বঙ্গভবনের কর্মচারীরা ইতিমধ্যেই ১৬৪% হারে ডিএ পেয়েছেন বলে দাবি করা হচ্ছে। তাহলে রাজ্যের বাকি কর্মচারীদের ক্ষেত্রে কেন আলাদা হিসাব— সেই প্রশ্নে চাপ বাড়ছে নবান্নের ওপর।


এছাড়াও হিসাবের সময়সীমা নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে। অভিযোগ, শুধুমাত্র ২০১৬ থেকে ২০১৯ সালের হিসাব দেওয়া হচ্ছে। অথচ ২০০৮ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত সময়ের বকেয়া নিয়ে কোনো স্পষ্টতা নেই। ফলে গোটা প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়েই প্রশ্ন তুলছেন কর্মচারীরা।
এই পরিস্থিতিতে আইনি পথে চাপ বাড়াতে শুরু করেছে ইউনিটি ফোরাম। সুপ্রিম কোর্টে কর্মচারীদের পক্ষে লড়াই করা বর্ষীয়ান আইনজীবী পি. চ্যাটার্জি ইতিমধ্যেই রাজ্য সরকারকে আইনি নোটিশ পাঠিয়েছেন। সেখানে স্পষ্ট বলা হয়েছে— ১৬৪%-এর কম হারে ডিএ প্রদান করা হলে তা সরাসরি আদালতের নির্দেশ লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হবে।
শুধু তাই নয়, পুরো হিসাবের স্বচ্ছতা জানতে আরটিআই-ও দাখিল করা হয়েছে। ফলে প্রশাসনিক এবং আইনি— দুই দিক থেকেই চাপ বাড়ছে।
আগামী ১৫ এপ্রিল ২০২৬ সুপ্রিম কোর্টে এই মামলার পরবর্তী শুনানি রয়েছে। ওইদিন রাজ্যের তরফে কমপ্লায়েন্স রিপোর্ট জমা দেওয়ার কথা। কর্মচারী সংগঠন ইতিমধ্যেই হুঁশিয়ারি দিয়েছে— সঠিক অঙ্ক না মেটালে আদালত অবমাননার অভিযোগ আনা হবে।
সব মিলিয়ে, ডিএ বকেয়া নিয়ে রাজ্যের পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হচ্ছে। কর্মচারীদের একাংশ এখন অপেক্ষা করছেন— আদালতের নির্দেশ বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, আর তাদের প্রাপ্য আদৌ পুরোপুরি মেলে কি না।








