বঙ্গে ওয়াকফ সম্পত্তি নথিভুক্তি নিয়ে বিতর্ক, মমতার হস্তক্ষেপ চাইছেন সিদ্দিকুল্লা

কেন্দ্রের ‘উমিদ’ পোর্টালে ওয়াকফ সম্পত্তির নথিভুক্তিকরণ শুরু হওয়ায় তৃণমূলের অস্বস্তি বাড়ল। সময়সীমা বাড়ানোর দাবি তুলে মুখ্যমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চাইলেন সিদ্দিকুল্লা চৌধুরী।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

বঙ্গে ওয়াকফ সম্পত্তি নথিভুক্তি নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক পরিস্থিতি জটিল হচ্ছে। কেন্দ্রীয় সরকারের ‘উমিদ’ পোর্টালে ওয়াকফ সম্পত্তির পূর্ণ বিবরণ জমা দিতে রাজ্যের সংখ্যালঘু বিষয়ক দফতর যে নির্দেশিকা জারি করেছে, তা ঘিরে রাজ্য রাজনীতিতে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এমন সময়, যখন তৃণমূল বারবার জানিয়েছে যে সংশোধিত ওয়াকফ আইন বাংলায় বলবৎ হবে না, তখন প্রশাসনের এই নয়া পদক্ষেপ স্বাভাবিক ভাবেই নানা প্রশ্ন তুলছে।

বৃহস্পতিবার নবান্ন সব জেলাশাসককে পত্র দিয়ে জানিয়েছে, নির্ধারিত সময়—৫ ডিসেম্বরের মধ্যেই ওয়াকফ সম্পত্তি নথিভুক্তি বাধ্যতামূলক ভাবে সম্পূর্ণ করতে হবে। ওয়াকফ বোর্ডের কর্তাদের বক্তব্য, কেন্দ্রীয় সময়সীমা না মানলে আইনগত জটিলতা তৈরি হতে পারে। তাদের দাবি, বাংলার প্রায় ৮০ শতাংশ ওয়াকফ সম্পত্তি আগেই ওয়ামসি পোর্টালে নথিভুক্ত ছিল, ফলে উমিদে আপলোড করা কঠিন নয়।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী রাজ্যে ৮,০৬৩টি ওয়াকফ এস্টেটের অধীনে রয়েছে ৮২,৬০০টি ওয়াকফ সম্পত্তি। কিন্তু শীর্ষ আদালতে ওয়াকফ আইন সংক্রান্ত মামলা বিচারাধীন থাকা সত্ত্বেও—নথিভুক্তিকরণ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্ট কোনও স্থগিতাদেশ দেয়নি। ফলে রাজ্য চাইলে এড়াতে পারত না। এ কারণেই এই নির্দেশিকা জারি করা হয়েছে বলে জানাচ্ছেন ওয়াকফ বোর্ডের আধিকারিকরা।

বঙ্গে ওয়াকফ সম্পত্তি নথিভুক্তি নিয়ে বিতর্ক, মমতার হস্তক্ষেপ চাইছেন সিদ্দিকুল্লা

তবে এই নির্দেশ সামনে আসতেই সংখ্যালঘু সমাজের মধ্যে অস্বস্তি বাড়ছে। সময়সীমা এত কম যে কাজ সম্পূর্ণ করা প্রায় অসম্ভব—এমনই দাবি রাজ্যের মন্ত্রী ও জমিয়তে-উলেমা-ই-হিন্দের সভাপতি সিদ্দিকুল্লা চৌধুরীর। তাঁর অভিযোগ, পোর্টালে বিবরণ দিতে গেলে ৪৬টি আলাদা তথ্য আপলোড করতে হয়—কোন বছর সম্পত্তি ওয়াকফ হয়, চৌহদ্দি কত, মোতোয়াল্লি কে, সম্পত্তির বাজারমূল্য কত, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট আছে কি না—সবকিছুই বিস্তারিত জানাতে হয়। এত বড় কাজ মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে শেষ করা সম্ভব নয় বলে তিনি দাবি জানান।
তিনি প্রকাশ্যে বলেছেন, মুখ্যমন্ত্রীকে অনুরোধ করবেন যাতে তিনি প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি লিখে উমিদ পোর্টালের নথিভুক্তিকরণের সময়সীমা বাড়ানোর দাবি তোলেন।

বঙ্গে ওয়াকফ সম্পত্তি নথিভুক্তি নিয়ে বিতর্ক, মমতার হস্তক্ষেপ চাইছেন সিদ্দিকুল্লা
বঙ্গে ওয়াকফ সম্পত্তি নথিভুক্তি নিয়ে বিতর্ক, মমতার হস্তক্ষেপ চাইছেন সিদ্দিকুল্লা

অন্যদিকে, কলকাতার মেয়র ও রাজ্যের মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিমের বক্তব্য ভিন্ন। তিনি মনে করেন, ওয়াকফ আইন নিয়ে আপত্তি থাকলেও সম্পত্তি নথিভুক্তিকরণে ক্ষতি নেই। তাঁর কথায়, জমির মালিকানা নিশ্চিত ভাবে প্রকাশ্যে থাকা স্বচ্ছতার দিক থেকেই ভাল।
কিন্তু আইএসএফ বিধায়ক ও ফুরফুরা শরিফের পিরজাদা নওশাদ সিদ্দিকি তৃণমূলের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর অভিযোগ, মুখ্যমন্ত্রী নিজেই বলেছিলেন রাজ্যে সংশোধিত ওয়াকফ আইন বলবৎ হবে না। অথচ এবার প্রশাসনের হাতেই সেই আইন অনুসরণের নির্দেশিকা দেওয়া হচ্ছে।

ওয়াকফ সম্পত্তি বেদখলের অভিযোগ বহুদিনের। বিরোধী বিজেপির মতে, ওয়াকফের জমি তৃণমূলের মাধ্যমেই ভূমি-দখলকারীদের হাতে চলে যাচ্ছে। তবে ওয়াকফ বোর্ডের কর্তারা পাল্টা বলছেন, জমি সংক্রান্ত বিষয় রাজ্যের এক্তিয়ারভুক্ত হলেও কেন্দ্রীয় আইন পাশ করিয়ে সেই অধিকারেই আঘাত করা হয়েছে। এই যুক্তি সুপ্রিম কোর্টে পেশ হলেও আদালত হস্তক্ষেপ করেনি।

তবে তৃণমূল এবার কোনও ঝুঁকি নিতে চাইছে না। সামনে ভোট। ওয়াকফ সম্পত্তি নথিভুক্তি সংখ্যালঘুদের কাছে স্পর্শকাতর ইস্যু। ভুল পদক্ষেপে রাজ্যের রাজনৈতিক পরিবেশ মেরুকরণ-মুখী হতে পারে—এটি মাথায় রেখে প্রশাসন সতর্ক। ওয়াকফ আইন সংশোধনের বিরুদ্ধে আন্দোলন, মুর্শিদাবাদ ও মালদায় আগুন—সব কিছুই এখনো রাজনৈতিক স্মৃতিতে তাজা।

সংখ্যালঘু ভোট তৃণমূলের বড় শক্তি। তাই একদিকে আইনের বাধ্যবাধকতা, অন্যদিকে ভোটের সমীকরণ—এই দুইয়ের মাঝেই নবান্নকে ভারসাম্য বজায় রাখতে হচ্ছে। এখন দেখার, জেলা প্রশাসন কত দ্রুত ওয়াকফ সম্পত্তি নথিভুক্তি উমিদ পোর্টালে সম্পন্ন করতে পারে এবং তৃণমূল কীভাবে এই স্পর্শকাতর ইস্যু সামাল দেয়।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

Advertisementspot_img

সদ্য প্রকাশিত

এই ক্যাটেগরির আরও খবর