লোকসভায় উত্তাল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এল বন্দে মাতরম বিতর্ক। স্বাধীনতা সংগ্রামের এই ঐতিহাসিক স্লোগানের মাহাত্ম্য তুলে ধরতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে বারবার ‘বঙ্কিমদা’ বলে সম্বোধন করেন। মুহূর্তেই আপত্তি তোলেন তৃণমূল সাংসদ সৌগত রায়। তাঁর অনুরোধ, “অন্তত বাবু বলুন।” এরপর প্রধানমন্ত্রী দ্রুত ভুল সংশোধন করে বলেন, “আচ্ছা, বঙ্কিমবাবু বলছি, দাদা।” এই কথোপকথনেই সৃষ্টি হয় নতুন বন্দে মাতরম বিতর্ক।
মোদী হালকা ব্যঙ্গের সুরে সৌগত রায়কে উদ্দেশ্য করে আরও বলেন, “আপনাকেও তো দাদা বলেই সম্বোধন করি।” সদনজুড়ে তখন হাসির রোল। তবে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের কেন্দ্রবিন্দু ছিল বন্দে মাতরমের মাহাত্ম্য। তিনি বলেন, “বন্দে মাতরম বহু প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করেছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মও অনুপ্রাণিত হবে।” তাঁর দাবি, সরকার চাইছে বন্দে মাতরমের সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব পুনরুদ্ধার করতে। এই মন্তব্যও নতুন করে জ্বালিয়ে দিল বন্দে মাতরম বিতর্ক।


বন্দে মাতরম বিতর্কে লোকসভার মাঝেই বঙ্কিমচন্দ্রকে ‘বঙ্কিমদা’ সম্বোধন মোদীর! কী বললেন?
প্রধানমন্ত্রী আরও আক্রমণ করেন ইন্দিরা গান্ধীর আমলের জরুরি অবস্থাকে। তাঁর অভিযোগ, “১৯৭৫ সালে বন্দে মাতরমের ১০০ বছর পূর্তিতে সংবিধানকেই রুদ্ধ করা হয়েছিল।” মোদীর কথায়, কংগ্রেস বন্দে মাতরমকে “অপমান” করেছে। তিনি দাবি করেন, কংগ্রেস ইচ্ছাকৃতভাবে গানটির গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাদ দিয়েছে। সেই ‘বাদ পড়া’ অংশ লোকসভায় পড়ে শোনান তিনি। তাঁর তোপ—“কংগ্রেস এখনও বন্দে মাতরমকে অসম্মান করছে।”

সদনে আরও বড় অভিযোগ ছুঁড়লেন মোদী। তাঁর বক্তব্য, প্রথমে বন্দে মাতরমকে ভাঙা হয়েছিল, আর পরে ভারতকে ভাঙা হয়েছে। এই বক্তব্য ঘিরেও তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে সদনের ভেতরে-বাইরে। বিরোধী বেঞ্চ থেকে প্রতিবাদ উঠলেও মোদী নিজের অবস্থানে অনড় থাকেন। এই অংশটি দ্রুতই সামাজিক মাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্র হয়ে ওঠে, এবং বন্দে মাতরম বিতর্ক চাঞ্চল্য বাড়ায়।
ইতিহাস টেনে প্রধানমন্ত্রী দাবি করেন, “জওহরলাল নেহরু নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে একবার চিঠিতে জানিয়েছিলেন—বন্দে মাতরম মুসলিমদের প্ররোচিত করতে পারে।” মোদীর কথায়, “এটাই বন্দে মাতরমের সঙ্গে করা সবচেয়ে বড় বিশ্বাসঘাতকতা।” তাঁর দাবি, কংগ্রেসের নীতিগত আপসই আজকের বিভাজনের ভিত্তি।


এই পুরো বিতর্কেই সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে ‘বঙ্কিমদা’ সম্বোধন। বিরোধীরা বলছেন, এটি বাংলার সাহিত্যিক ঐতিহ্যের প্রতি অসম্মান। অপরদিকে বিজেপি শিবির দাবি করছে, প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে কোনও অসম্মান নেই; বরং বঙ্কিমচন্দ্রের প্রতি স্নেহমিশ্রিত সম্বোধন ছিল সেটি। কিন্তু রাজনৈতিক উত্তেজনার আবহে বিষয়টি নতুন করে উস্কে দিয়েছে বন্দে মাতরম বিতর্ককে।
লোকসভার এই আলোচনায় একদিকে যেমন সাহিত্য-ঐতিহ্যের যথার্থ সম্মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, তেমনই আরও ঘনীভূত হয়েছে জাতীয়তাবাদ বনাম রাজনৈতিক অবস্থানের বিতর্ক। বন্দে মাতরমের ঐতিহাসিক প্রাসঙ্গিকতা এবং বর্তমান সময়ে তার রাজনৈতিক ব্যবহার—উভয়ই নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
সুস্পষ্ট, লোকসভায় এই আলোচনা দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিধ্বনিত হবে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে। আর মোদীর ‘বঙ্কিমদা’ মন্তব্য নিঃসন্দেহে ২০২৬ সালের অন্যতম আলোচিত রাজনৈতিক মুহূর্ত হয়ে থাকবে।









