শুভেন্দু অধিকারীর উত্থান, নন্দীগ্রাম ও বিজেপি-র নেপথ্য কাহিনী।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

অর্ক সানা, নজরবন্দিঃ শুভেন্দু অধিকারীর উত্থান নিয়ে চর্চা চলছে চায়ের ঠেকে। বেশ কিছুদিন ধরেই বঙ্গ রাজনীতির রঙ্গমঞ্চে শুভেন্দু অধিকারী নামক নাটক অভিনীত হচ্ছে! আচমকাই পূর্ব মেদিনীপুরের অধিকারী পরিবারের অন্যতম রাজনীতিক শুভেন্দু বাবুর মনে হচ্ছে দলের মধ্যে কেউ বা কারা অত্যন্ত অন্যায় করে চলেছেন প্রতিনিয়ত! রাজনৈতিক মহলের ব্যাখ্যা এই কেই বা কারা যে স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় তা নিয়ে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই।

আরও পড়ুনঃ শুভেন্দু-সৌগত যোগ দিচ্ছেন বিজেপি-তে? অর্জুনের দাবিকে ‘দিবাস্বপ্ন’ আখ্যা সৌগতর।

গতকয়েক টি রাজনীতি যুক্ত অরাজনৈতিক মঞ্চ ব্যাবহার করে দলের সর্বোচ্চ নেতৃত্বকে বারংবার বার্তা দিয়েছেন আমি আমি করে কিছু হয় না, আমরা বলতে হয়। তিনি আমিত্বের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে একাধিকবার বলেছেন, “আমি লিফটে উঠিনি, আমি কলেজে গেম সেক্রেটারি ছিলাম সেখান থেকে আজ মন্ত্রী, আমি আমফান বিপর্যয়ের পরে একাই নন্দীগ্রামে ছিলাম, আমি অতীত ভুলিনি ইত্যাদি ইত্যাদি…!”

কিন্তু আচমকাই শুভেন্দু তৃণমূল নেতা শুভেন্দু অধিকারী থেকে অনুগামী ভাইদের নেতা বা জননেতা শুভেন্দু হওয়ার চেষ্টায় মাতলেন কেন? রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন এই হিসেব দেখতে গেলে তাকাতে হবে ইতিহাসের দিকে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের চর্চায় থাকা শুভেন্দু অধিকারীকে নিয়ে অনেকেই বলছেন বা বলার চেষ্টা করছেন নন্দীগ্রামের জমিরক্ষা কমিটির আন্দোলন শুভেন্দু অধিকারীকে প্রতিষ্ঠা দিয়েছিল। কিন্তু ইতিহাস বলছে অন্য কথা।

শুভেন্দু অধিকারীর উত্থান, কে এই শুভেন্দু অধিকারী? রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, তৃণমূলের জন্মলগ্ন থেকে মমতা বন্দোপাধ্যায়ের সঙ্গ দিয়েছিলেন সেই সব কংগ্রেসী ঘরানার রাজনীতিক দের মধ্যে একজন ছিলেন শিশির অধিকারী। স্বাধীনতা সংগ্রামে যুক্ত থাকা অধিকারী পরিবারের সদস্য শিশির একজন দক্ষ সংগঠক। তিনি টানা ২৫ বছর কাঁথি পুরসভার পুরপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেছেন। সেই শিশির অধিকারীর পুত্র শুভেন্দু অধিকারীকে প্রথমবার লাইমলাইটে আসার সুযোগ দেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। নন্দীগ্রাম আন্দোলন গড়ে ওঠা তো দূরের কথা বাংলার বৃহত্তর অংশের মানুষ তখন নন্দীগ্রামের নামই শোনেন নি।

শিশির অধিকারীর পুত্র অল্প বয়স্ক শুভেন্দু অধিকারীকে ২০০৪ সালে তমলুক লোকসভা আসনে তৃণমূল কংগ্রেসের টিকিট দেন মমতা। কিন্তু তৎকালীন সিপিআইএমের ২বারের সাংসদ দর্দোন্ডপ্রতাপ লক্ষন শেঠের কাছে পরাজিত হন শুভেন্দু! তৃতীয়বারের জন্যে সাংসদ হন লক্ষণ। কিন্তু এখানেই সুযোগ পাওয়া শেষ হয়নি শুভেন্দুর। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শিশির অধিকারীর অপর আস্থা রেখে ২ বছরের মাথায় ২০০৬ সালে ফের কাঁথি দক্ষিন বিধানসভা কেন্দ্র থেকে টিকিট দেন শুভেন্দু কে! কাঁথি-তে শিশির অধিকারীর একচ্ছত্র দাপট জয় এনে দেয় শুভেন্দু অধিকারী কে। তখনও নন্দিগ্রামে জমি অধিগ্রহনের কোন ঘটনাই ঘটেনি।

এরপর আসে ২০০৭, সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামে শুরু হয় আন্দোলন। রাজ্যে হাওয়া লাগে পরিবর্তনের। মমতা কে মুখ করে তখন রাজকীয় আন্দোলন শুরু হয় রাজ্যজুড়ে। রাজ্যের মানচিত্রে চিরকালের জন্যে জায়গা দখল করে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম। সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম আন্দোলনের সময় বাংলার বুদ্ধিজীবী মহল থেকে শুরু করে একাধিক রাজনৈতিক ব্যাক্তিত্ব পাশে দাঁড়ান এলাকাবাসীর। এমনকি আসেন লালকৃষ্ণ আডবানির মত নেতাও, কিন্তু আন্দোলনের মুখ হয়ে উঠেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। নন্দীগ্রামে শিশির-শুভেন্দু আর সিঙ্গুরে বেচারাম-রবীন্দ্রনাথরা হয়ে ওঠেন মমতা বন্দোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে পরিবর্তনের কাণ্ডারী! ফের ২০০৯ সালে লোকসভা নির্বাচনে পিতা-পুত্র দুজনকেই টিকিট দেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তমলুক এবং কাঁথি আসন থেকে জয়ী হন দুজনেই। ইউপিএ সরকারের অন্যতম জোটসঙ্গী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শিশির অধিকারী কে কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রমন্ত্রীর আসনে বসান গ্রামোন্নয়ন দফতরের।

এরপর ২০১৪ সালেও জয়ী কম্বিনেশন ভাঙেননি তৃণমূল সূপ্রিমো। ফের লোকসভায় যান শুভেন্দু-শিশির। ২০১৬ সালে রাজ্যে দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসার পর শুভেন্দু কে মন্ত্রীত্ব দেন মমতা। তমলুক লোকসভা আসন ছেড়ে নন্দীগ্রাম বিধানসভার বিধায়ক হন শুভেন্দু। তখন তিনি প্রায় ৮১ হাজার ভোটে জিতেছিলেন। ওই বছরেই তমলুক লোকসভার উপ-নির্বাচনে শিশির অধিকারীর অন্য পুত্র দিব্যেন্দু কে টিকিট দেন মমতা। তমলুকের সাংসদ নির্বাচিত হন দিব্যেন্দু অধিকারী। সে সময় নন্দীগ্রাম থেকে প্রায় ১ লক্ষ ৪০ হাজার লিড পেয়েছিলেন দিব্যেন্দু অধিকারী। অর্থাৎ শুভেন্দু অধিকারীর থেকে প্রায় ৬০ হাজার বেশি ভোটের লিড পেয়েছিলেন তিনি।

তবে ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রাম থেকে তৃণমূলের লিড কমে হয় প্রায় সাড়ে ৬৮ হাজার। আর বিজেপি-র ভোট ২০১৬ সালে যেখানে ছিল ১০ হাজারের কিছু বেশি, তা ২০১৯ সালে বেড়ে হয়েছে ৬২ হাজারের বেশি! এই পরিসংখ্যান বলছে, ভোট কমেছে তৃণমূলের, বেড়েছে বিজেপি-র। কিন্তু কেন এমন হল? শুভেন্দু অধিকারীর গড়ে বিজেপি-র এহেন উত্থান কিভাবে? রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, লোকাল তৃণমূল নেতাদের লাগামহীন দূর্নীতির জেরেই নন্দীগ্রামের মানুষ আস্থা হারিয়েছেন তৃণমূলে। আমপানের ক্ষতিপূরণ নিয়ে বিস্তর গরমিলের অভিযোগ উঠেছে নন্দীগ্রামে! শুভেন্দুও নন্দীগ্রামে এসে প্রকারান্তরে তা স্বীকার করেছেন!

উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হল শুভেন্দু অধিকারী অভিযোগ করেছেন আমফানের পর শুধু আমি, একা আমি ছিলাম মানুষের পাশে। আর কেউ আসেননি! সুতরাং যে দুর্নীতি নন্দীগ্রামের মানুষের সাথে প্রতিনিয়ত দূরত্ব বাড়াচ্ছে তৃণমূলের শুভেন্দুর কথা অনুযায়ী সেই নন্দীগ্রামকে একাই সামলেছেন তিনি! এখন আবার শুভেন্দু দলহীন-জনসংযোগ শুরু করেছেন। সব মিলিয়ে এই আবহের সুযোগ নিচ্ছে বিজেপি। নন্দীগ্রামের ২টি ব্লককে ৫টি মণ্ডলে ভাগ করেছে গেরুয়া শিবির। দলবদলের জল্পনার আবহে এখন দেখার ভবিষ্যতে সেই গেরুয়া শিবিরের নেতৃত্বে শুভেন্দু অধিকারীকে দেখা যাবে নাকি নিজের এলাকায় দূর্নীতি কে প্রশ্রয় দেওয়া নেতাদের দমন করে তৃণমূলেই থেকে যান শিশির পুত্র।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহুর্তে। আমাদের ফলো করুন
Google News Google News

সদ্য প্রকাশিত