মাদ্রাসা শিক্ষক নিয়োগে বড়সড় আইনি সঙ্কটে পড়েছেন ৩৬১ জন শিক্ষক। তাঁদের নিয়োগ প্রক্রিয়া ঘিরে সুপ্রিম কোর্টে ওঠা মামলায় বিচারপতি দীপঙ্কর দত্তের বেঞ্চ বৃহস্পতিবার তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন। আদালতের পর্যবেক্ষণ স্পষ্ট—যথাযথ নিয়ম না মেনে নিয়োগ হয়ে থাকলে সেই চাকরি বাতিল হওয়াই স্বাভাবিক পরিণতি।
এই মামলার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে—২০১৫ ও ২০১৬ সালের নোটিফিকেশন অনুযায়ী এই শিক্ষকদের নিয়োগ বৈধ কি না। পিটিশনারদের দাবি ছিল, শিক্ষকদের ন্যূনতম যোগ্যতা ছিল এবং তিন সদস্যের কমিটি তাঁদের চাকরি বহাল রাখার সিদ্ধান্ত যথার্থই নিয়েছিল। কিন্তু আদালতে সেই দাবির সপক্ষে নিয়মতান্ত্রিক প্রমাণ তুলে ধরতে না পারায় পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টে যায়।
(ব্রেকিং – ভুল তথ্য দিয়ে শিক্ষক নিয়োগে আবেদন, ২৬ প্রার্থীকে ‘চিহ্নিত’ করল SSC)
শুনানিতে বিচারপতি দীপঙ্কর দত্ত প্রথমেই জানতে চান—কোন নিয়ম বা Recruitment Rules অনুসরণ করে এই নিয়োগ হয়েছিল। পিটিশনারের পক্ষ ২০১৫ ও ২০১৬ সালের বিজ্ঞপ্তির কথা বললেও, বিচারপতি স্পষ্ট করে দেন—নোটিফিকেশন নয়, নির্দিষ্ট নিয়োগ বিধির প্রমাণ প্রয়োজন। এর পরেই উঠে আসে আরও গুরুতর প্রশ্ন।
চাকরি বাতিল হতে পারে ৩৬১ জন শিক্ষকের, নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে কী বলল সুপ্রিম কোর্ট?

বিচারপতির প্রশ্ন ছিল অত্যন্ত সরাসরি এবং আইনি কাঠামো অনুযায়ী ওজনদার।
তিনি জানতে চান—
২০১৫ সালের রুলস কি শুধুমাত্র মাইনরিটি এবং মাদ্রাসার জন্য প্রযোজ্য ছিল?
২০১৬ সালের নোটিফিকেশন কীভাবে কার্যকর হলো?
নিয়োগের আগে শূন্যপদ ডিস্ট্রিক্ট ইনস্পেক্টর (DI) দ্বারা অনুমোদিত হয়েছিল কি?
সংবাদপত্রে যথাযথ বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছিল কি?
যে মাদ্রাসায় নিয়োগ হয়েছে, তার স্বীকৃতির মেয়াদ কি বৈধ ছিল?
নথি পর্যালোচনা করতে গিয়ে বিচারপতি মন্তব্য করেন—কয়েকটি মাদ্রাসার ক্ষেত্রে স্বীকৃতির মেয়াদ সেই সময় উত্তীর্ণ হয়ে গিয়েছিল। এই পর্যবেক্ষণ মামলার মোড় একেবারে বদলে দেয়। রাজ্যের সরকারি আইনজীবী এবং পিটিশনারদের আইনজীবী দীর্ঘ সওয়াল–জবাব করলেও আদালত মনে করে—যথাযথ নথিপত্র না থাকলে এই নিয়োগ বৈধ বলা যাবে না।
শুনানির শেষে বিচারপতি দীপঙ্কর দত্ত ছয়টি নির্দিষ্ট প্রশ্ন রাখেন, যা এই মামলার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। এই প্রশ্নগুলোর সন্তোষজনক উত্তর পাওয়া না গেলে ৩৬১ জন শিক্ষকের চাকরি বাতিল হওয়া প্রায় নিশ্চিত।
বিচারপতির প্রশ্নগুলো হল—
সংশ্লিষ্ট মাদ্রাসার সরকারী স্বীকৃতির প্রমাণ কী?
নিয়োগ যদি ম্যানেজিং কমিটির মাধ্যমে হয়, সেই কমিটি যথাযথভাবে গঠিত হয়েছিল তার প্রমাণ কোথায়?
সেই সময়ে স্কুলের স্টাফ প্যাটার্ন ও শূন্যপদের নথি কোথায়?
ডিআই-এর অনুমোদন ছিল তার প্রমাণ কী?
সংবাদপত্রে প্রকাশিত বিজ্ঞাপন আদালতে দেখাতে হবে।
নিয়োগের আগে কোনও Fresh Selection Process বা ইন্টারভিউ হয়েছিল কি না, তার নথি চাই।
এই ছয়টি প্রশ্নের উত্তর দিতে রাজ্য সরকার বা মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশনকে পরবর্তী শুনানির ৭২ ঘণ্টা আগে হলফনামা জমা দিতে হবে। বিচারপতির বক্তব্যে স্পষ্ট—যদি প্রশ্নগুলির উত্তর সন্তোষজনক না হয়, তাহলে এই নিয়োগকে অবৈধ বলেই গণ্য করা হবে।
মামলার পরবর্তী শুনানির দিন নির্ধারণ করা হয়েছে ১৭ ডিসেম্বর। তার আগে শিক্ষক সমাজ, রাজনৈতিক মহল এবং প্রশাসন—সবচক্ষু এখন সুপ্রিম কোর্টের দিকে।
যাঁরা বহু বছর ধরে চাকরি করছেন, তাঁদের ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চয়তার দোরগোড়ায় দাঁড়ানো। মামলার মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে আদালতে জমা দেওয়া সেই ছ’টি প্রশ্নের উত্তরই।







