মহাকাশ ছিল তাঁর ঘর, আর কক্ষপথ ছিল নিত্যযাত্রার পথ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই অধ্যায়েই টানল ইতি। ২৭ বছরের দীর্ঘ ও গৌরবময় কর্মজীবনের পর অবসর গ্রহণ করলেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন নভশ্চর সুনীতা উইলিয়ামস। আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে কাটানো ৬০৮ দিন, একের পর এক স্পেসওয়াক, বিপজ্জনক মিশনে নেতৃত্ব—সব মিলিয়ে মানব মহাকাশ অভিযানের ইতিহাসে তিনি রেখে গেলেন এক অনন্য ছাপ।
মঙ্গলবার বিবৃতি দিয়ে অবসরের কথা জানিয়েছে NASA। জানানো হয়েছে, গত ২৭ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে অবসর গ্রহণ করেছেন ৬০ বছর বয়সি Sunita Williams। নাসার হয়ে তাঁর পথচলা শুরু হয়েছিল ১৯৯৮ সালে। তার পর আর ফিরে তাকাতে হয়নি।
সুনীতার প্রথম মহাকাশযাত্রা ২০০৬ সালের ডিসেম্বরে। স্পেস শাটল ডিসকভারিতে চড়ে তিনি প্রথম পা রাখেন মহাকাশে। নাসার এক্সপিডিশন ১৪/১৫ মিশনে ফ্লাইট ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে দায়িত্ব সামলান। সেই অভিযানের সময় চারটি স্পেসওয়াক করে গড়েন বিশ্বরেকর্ড। ২০১২ সালে দ্বিতীয় অভিযানে ফের মহাকাশে যান তিনি। ১২৭ দিনের সেই মিশনে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের কমান্ডারের দায়িত্বও পালন করেন সুনীতা—এক অনন্য সম্মান।
তাঁর তৃতীয় ও শেষ অভিযান ছিল ২০২৪ সালে। Boeing Starliner-এ চড়ে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে যান তিনি, সঙ্গী ছিলেন মার্কিন নভশ্চর Butch Wilmore। পরিকল্পনা ছিল মাত্র ১০ দিনের সফর। কিন্তু যান্ত্রিক ত্রুটির জেরে প্রায় ১০ মাস মহাকাশে আটকে থাকতে হয় তাঁদের। অবশেষে ২০২৫ সালের মার্চে ২৮৬ দিন পর পৃথিবীতে ফেরেন দু’জনে—যা সাম্প্রতিক কালের সবচেয়ে নাটকীয় মহাকাশ প্রত্যাবর্তনের অন্যতম।

দীর্ঘ কর্মজীবনে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন বা International Space Station-এ মোট তিনটি অভিযান সম্পন্ন করেছেন সুনীতা। নাসার প্রশাসক Jared Isaacman তাঁকে মানববাহী মহাকাশ অভিযানের অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর কথায়, সুনীতা শুধু মহাকাশ স্টেশনে দক্ষ নেতৃত্বই দেননি, পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে বাণিজ্যিক অভিযানের পথও প্রশস্ত করেছেন।
পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতক সুনীতা ফ্লরিডার মেলবোর্নে অবস্থিত ফ্লরিডা ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং ম্যানেজমেন্টে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর যোগ দেন মার্কিন নৌবাহিনীতে। হেলিকপ্টার ও ফিক্সড-উইং মিলিয়ে ৪০টিরও বেশি বিমানে ৪,০০০ ঘণ্টার বেশি উড়ানের অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর ঝুলিতে।
২৭ বছরের কর্মজীবনে মোট ৬০৮ দিন মহাকাশে কাটিয়েছেন সুনীতা—যা নাসার ইতিহাসে দ্বিতীয় দীর্ঘতম। পাশাপাশি ৯টি স্পেসওয়াকে মোট ৬২ ঘণ্টা ৬ মিনিট কাটিয়ে মহিলা নভশ্চরদের মধ্যে সর্বোচ্চ রেকর্ডও তাঁর দখলে। মহাকাশে ম্যারাথন দৌড়ানো প্রথম মানুষও ছিলেন তিনিই।
অবসর ঘোষণার পর সুনীতা বলেন, “মহাকাশ আমার অত্যন্ত প্রিয় জায়গা। তিন বার সেখানে যাওয়ার সুযোগ পাওয়া আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সম্মান।” আসন্ন Artemis 2 অভিযান নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই হাসতে হাসতে তিনি বলেন, “যেতে তো চাই, কিন্তু আমার স্বামী আমাকে মেরে ফেলবেন!” তারপরই যোগ করেন, “এ বার ঘরে ফেরার সময়। পরবর্তী প্রজন্মই মহাকাশযাত্রার ইতিহাসে তাদের জায়গা করে নিক।”



