এসআইআর প্রক্রিয়া: রোল অবজার্ভার নিয়োগে নবান্ন–কমিশন টানাপড়েন তুঙ্গে, কাদের দেওয়া হল দায়িত্ব?

১২ জন রোল অবজার্ভার ও এক স্পেশাল অবজার্ভার নিয়োগ করল কমিশন। অফিসার বাছাই নিয়ে নবান্ন ও কমিশনের টানাপড়েন জারি থাকলেও শেষ পর্যন্ত জেলা ধরে দায়িত্ব চূড়ান্ত।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

রাজ্যের এসআইআর প্রক্রিয়া ঘিরে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক উত্তাপ আরও বাড়ল। শুক্রবার সন্ধেয় নির্বাচন কমিশন আচমকাই ১২ জন ইলেক্টোরাল রোল অবজার্ভার এবং একজন স্পেশাল রোল অবজার্ভার নিয়োগের ঘোষণা করে। এভাবে জেলা ধরে অবজার্ভার বাছাই সাধারণ নির্দেশ নয়—বরং গত ১০ দিনে নবান্ন ও কমিশনের মধ্যে টানাপড়েনের পরিপূর্ণ প্রকাশ বলেই মনে করছেন আমলাতন্ত্রের একাংশ।

কমিশনের নির্দেশ অনুযায়ী, ইলেক্টোরাল রোল অবজার্ভাররা জেলার ডিইও অর্থাৎ জেলা শাসক এবং ইআরওদের কাজ খতিয়ে দেখবেন। কোথাও ভুল বা অনিয়ম থাকলে তা চিহ্নিত করবেন। এসআইআর প্রক্রিয়া কমিশনের নির্দেশ অনুযায়ী চলছে কি না, প্রতিটি ধাপের ওপর নজর রাখাই তাঁদের মূল দায়িত্ব। আর নিযুক্ত স্পেশাল রোল অবজার্ভার সুব্রত গুপ্ত সামগ্রিক ভাবে রাজ্যের ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজ দেখবেন।

এসআইআর প্রক্রিয়া: রোল অবজার্ভার নিয়োগে নবান্ন–কমিশন টানাপড়েন তুঙ্গে, কাদের দেওয়া হল দায়িত্ব?

সিইও দফতর সূত্রে ব্যাখ্যা, সুব্রত গুপ্ত–কে বেছে নেওয়া সহজ ছিল। তিনি অবসরপ্রাপ্ত আইএএস, তাই প্রশাসনিক দায়িত্বে কোনও সংঘাত নেই। কিন্তু সবচেয়ে কঠিন ছিল রাজ্যের ১২ জন কর্মরত আইএএস অফিসার নির্বাচন করা। নিয়ম অনুযায়ী, কমিশন প্রথমে রাজ্য সরকারের কাছে অফিসারদের নাম চায়। তারপর সেই তালিকা থেকে নিজেদের পছন্দমতো অফিসার বেছে নেয়।

এসআইআর প্রক্রিয়া: রোল অবজার্ভার নিয়োগে নবান্ন–কমিশন টানাপড়েন তুঙ্গে, কাদের দেওয়া হল দায়িত্ব?
এসআইআর প্রক্রিয়া: রোল অবজার্ভার নিয়োগে নবান্ন–কমিশন টানাপড়েন তুঙ্গে, কাদের দেওয়া হল দায়িত্ব?

সেখানে থেকেই শুরু টানাপড়েন। কমিশনের একটি সূত্র জানাচ্ছে, নবান্ন যেই তালিকা পাঠায়, তাতে স্বাস্থ্য সচিব নারায়ণ স্বরূপ নিগম, গ্রামোন্নয়ন দফতরের সচিব উলগানাথন, তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের সচিব শান্তনু বসু-সহ বেশ কয়েকজন সিনিয়র আইএএসের নাম ছিল। রাজ্যের যুক্তি—এঁরা অভিজ্ঞ, জেলার প্রশাসনিক কাঠামো সম্পর্কে ওতপ্রোতভাবে জড়িত, তাই এসআইআর প্রক্রিয়া তদারকির জন্য তাঁরা উপযুক্ত।

কিন্তু কমিশনের পাল্টা যুক্তি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাদের মত, গুরুত্বপূর্ণ দফতরের মাথায় থাকা অফিসারদের এক মাসের জন্য অন্য দায়িত্বে পাঠালে সরকারি দফতরের দৈনন্দিন কাজে বড়সড় প্রভাব পড়বে। তাই তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্বপূর্ণ দফতরে কর্মরত আইএএসদেরই রোল অবজার্ভার করা উচিত।

যদিও কমিশন প্রথমে যে তালিকা তৈরি করে, তাতে কয়েকজন সিনিয়র অফিসারের নাম ছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে তাঁদের নাম বাদ দেওয়া হয়। কমিশনের এক সূত্র বলেছে, প্রতিটি নাম ধরে কঠোর স্ক্রুটিনি হয়েছে। শেষ পর্যন্ত এমন অফিসারদেরই বেছে নেওয়া হয়েছে যাঁরা গুরুত্বপূর্ণ দফতর সামলাচ্ছেন না।

নবান্নের তরফে অবশ্য ভিন্ন ব্যাখ্যা পাওয়া যাচ্ছে। এক শীর্ষ আমলার মতে, সব প্রশাসনে দুই ধরনের অফিসার থাকেন—কেউ বড় দায়িত্ব পান, কেউ পান না। বাম আমলাতন্ত্রেও ছিল, বর্তমানেও তেমনই রয়েছে। তাই “কম গুরুত্বপূর্ণ পদে” থাকা অফিসারদের নির্বাচন প্রশাসনিক চালচিত্রের মধ্যেই পড়ে। অনেকের মতে, কমিশনের সিদ্ধান্তে স্থানীয় অফিসারদের মতামলই মনোনীত হয়েছে। দিল্লি সিইও দফতরের ওপরই ভরসা করেছে।

এমন বিতর্কের মাঝেই কমিশন ঘোষণা করে জেলা ধরে কারা এসআইআর প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করবেন—

জেলায় জেলায় দায়িত্বপ্রাপ্ত আইএএস অফিসারদের তালিকা:
১) স্মিতা পান্ডে—পশ্চিম বর্ধমান, পূর্ব বর্ধমান, বীরভূম
২) তন্ময় চক্রবর্তী—মুর্শিদাবাদ, মালদা
৩) রণধীর কুমার—উত্তর ২৪ পরগনা, কলকাতা (উত্তর)
৪) সি. মুরুগান—দক্ষিণ ২৪ পরগনা, কলকাতা (দক্ষিণ)
৫) আর. অর্জুন—কোচবিহার, আলিপুরদুয়ার, জলপাইগুড়ি
৬) রাজীব কুমার / জগদীশ মিনা—হাওড়া
৭) নীলম মিনা—পূর্ব মেদিনীপুর, পশ্চিম মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম
৮) অশ্বিনী কুমার যাদব—উত্তর দিনাজপুর, দক্ষিণ দিনাজপুর
৯) নিরঞ্জন কুমার—দার্জিলিং, কালিম্পং
১০) দেবী প্রসাদ করানাম—পুরুলিয়া, বাঁকুড়া
১১) রচনা ভগত—নদিয়া
১২) ড. বিশ্বনাথ—হুগলি

প্রশাসন সূত্রের মতে, এই পুরো প্রক্রিয়া প্রমাণ করে যে এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে কমিশন কোনও ঝুঁকি নিতে চাইছে না। রাজ্যজুড়ে ভোটার তালিকা সংশোধন এখন সংবেদনশীল পর্যায়ে পৌঁছেছে। অভিযোগ, বাদ যাওয়া বা ডুপ্লিকেট নামের সংখ্যা বাড়ছে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাজনৈতিক চাপান-উতোর। তাই প্রতিটি জেলার উপর কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতেই কমিশন একযোগে রোল অবজার্ভার নিয়োগ করেছে।

এখন নজর থাকবে—এই পর্যবেক্ষকরা জমি–স্তরে কতটা কার্যকরভাবে কাজ করতে পারেন এবং এসআইআর-এর কাজে তাঁদের হস্তক্ষেপে ত্রুটি কমে কি না।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহুর্তে। আমাদের ফলো করুন
Google News Google News

সদ্য প্রকাশিত