ভারতের মাটিতে প্রায় এক বছর ধরে শেখ হাসিনা যে অজ্ঞাতবাসে রয়েছেন, তা নিয়ে বাংলাদেশে রাজনৈতিক বিতর্ক তুঙ্গে। গণবিক্ষোভ ও সংরক্ষণ বিরোধী আন্দোলনের জেরে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকেই বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন। কিন্তু শেখ হাসিনা কতদিন ভারতে থাকবেন, সেই প্রশ্ন ঘিরে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে।
শনিবার এক সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমকে সাক্ষাৎকারে ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শংকর স্পষ্ট জানিয়ে দেন—হাসিনার দেশে ফেরা তাঁদের হাতে নয়। তাঁর কথায়, “তিনি একটি বিশেষ পরিস্থিতিতে ভারতে এসেছিলেন। নিজের দেশের পরিস্থিতি বিচার করেই সিদ্ধান্ত নেবেন তিনি।” এই বক্তব্যের পরই পরিষ্কার হয়ে যায়, বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ চাপের জবাবে দিল্লি সতর্ক কূটনৈতিক পথ বেছে নিয়েছে।
শেখ হাসিনা কতদিন ভারতে থাকবেন? প্রত্যর্পণের চাপে কূটনৈতিক জবাব দিলেন জয়শংকর
গত বছরের আগস্টে বাংলাদেশজুড়ে ছাত্র আন্দোলন ও ক্রমবর্ধমান গণবিক্ষোভে আওয়ামি লিগ সরকারের পতন ঘটে। সামরিক পাহারায় ঢাকা ছেড়ে ভারতে আসেন মুজিবকন্যা শেখ হাসিনা। তারপর থেকেই তিনি ভারতের রাজনৈতিক আশ্রয়ে রয়েছেন বলে কূটনৈতিক মহলের দাবি। অন্যদিকে ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তবর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর হাসিনার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রুজু হয়।
ঢাকার আন্তর্জাতিক ট্রাইবুনাল ইতিমধ্যে গণহত্যার মামলায় হাসিনার মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করেছে। একই সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সম্পত্তি ক্রোক করে নিহত ও আহতদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশও দিয়েছে আদালত। আরও একটি জমি দুর্নীতি মামলায় তাঁকে ২১ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ঢাকা টানা দু’বার নয়াদিল্লিকে প্রত্যর্পণের আবেদন জানিয়েছে বলে বিদেশমন্ত্রক সূত্রে খবর।
ঠিক এই অবস্থায় জয়শংকরকে প্রশ্ন করা হয়েছিল—শেখ হাসিনা কি যতদিন ইচ্ছা ভারতে থাকতে পারবেন? উত্তরে তিনি জানান, “এটি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। পরিস্থিতি অনুকূল হলেই তিনি সিদ্ধান্ত নেবেন।’’ তাঁর বক্তব্যে পরিষ্কার, ভারত প্রকাশ্যে কোনওপক্ষ নিচ্ছে না; বরং হাসিনার নিরাপত্তা এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি—দুটোই বিবেচনায় রেখেই এগোচ্ছে দিল্লি।
বাংলাদেশে গণবিক্ষোভ শুরুর পর থেকেই দুই দেশের সম্পর্ক টানাপড়েনের মধ্যে রয়েছে। হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর সেই সম্পর্ক আরও জটিল হয়েছে। তবে জয়শংকর এদিন উল্লেখ করেন, ভারতের মূল আগ্রহ বাংলাদেশের গণতন্ত্র সুসংহত হওয়া। তাঁর কথায়, “আমরা চাই বাংলাদেশে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হোক। জনগণের ইচ্ছাকেই প্রতিফলিত করুক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া।”
এই মন্তব্য স্পষ্ট করে দেয়—ঢাকার নির্বাচন ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে কেন্দ্র করেই ভারতের কূটনৈতিক অবস্থান নির্ধারিত হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রশ্নও উঠছে—বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল না হওয়া পর্যন্ত শেখ হাসিনা আদৌ দেশে ফিরতে পারবেন কি না।
কূটনৈতিক মহলের মতে, বাংলাদেশের অন্তবর্তী সরকারের প্রত্যর্পণের চাপ যতই বাড়ুক, ভারত সরাসরি কোনও সিদ্ধান্তে যাচ্ছে না। কারণ দেশত্যাগী সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ভবিষ্যৎ শুধু আইনি নয়, আঞ্চলিক রাজনৈতিক সমীকরণকেও প্রভাবিত করতে পারে। ফলে আপাতত স্পষ্ট—শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান আরও দীর্ঘ হতে পারে, যদি না বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আমূল বদলায়।







