নজরবন্দি ব্যুরো: সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল জুবাইলে (Jubail) গ্যাস-সংক্রান্ত একটি স্থাপনায় বিস্ফোরণ ও আগুনের খবর ঘিরে পশ্চিম এশিয়ায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ইজরায়েলি সংবাদমাধ্যমের দাবি, ইয়েমেনের হুতি (Houthis) গোষ্ঠী এই হামলার নেপথ্যে রয়েছে। তবে সৌদি কর্তৃপক্ষ এখনও জুবাইলের ঘটনার জন্য হুতিদের দায়ী করে কোনও সরকারি ঘোষণা করেনি।
রবিবার সৌদির পূর্বাঞ্চলের শিল্পাঞ্চলে বিস্ফোরণের শব্দ ও আগুনের খবর সামনে আসে। তুরস্কের আনাদোলু এজেন্সি-সহ বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে, জুবাইল ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটির আশপাশে গ্যাস-সংক্রান্ত স্থাপনায় বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যায়। জুবাইল সৌদি আরবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও জ্বালানি কেন্দ্র, যেখানে পেট্রোকেমিক্যাল, গ্যাস ও পরিশোধন-সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো রয়েছে।
ইজরায়েলের চ্যানেল ১৪-এর প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, লক্ষ্য ছিল সৌদি আরামকোর (Saudi Aramco) একটি গ্যাস প্ল্যান্ট। ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবি (IRIB) আবার আরব সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে জুবাইল ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটির একটি গ্যাস স্থাপনায় আগুন লাগার কথা জানিয়েছে। তবে ঘটনার প্রকৃতি, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এবং হামলার উৎস নিয়ে এখনও স্বাধীনভাবে নিশ্চিত তথ্য সামনে আসেনি।
এই ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইয়েমেনের হুতিদের সঙ্গে সৌদি আরবের সংঘাতের নতুন মাত্রা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। গত জুলাইয়ে হুতিরা সৌদি-সংযুক্ত জাহাজের বিরুদ্ধে ‘সামুদ্রিক অবরোধ’ ঘোষণার কথা জানিয়েছিল। এরপর সৌদি তেলবাহী জাহাজ লক্ষ্য করে হামলার দাবিও করেছে তারা।
হুতিদের এই পদক্ষেপের প্রভাব ইতিমধ্যেই লোহিত সাগর (Red Sea) ও বাব-এল-মান্দেব (Bab el-Mandeb) জলপথে পড়েছে। একাধিক বাণিজ্যিক জাহাজ ওই অঞ্চলে গতিপথ পরিবর্তন করেছে বলে জাহাজ চলাচলের তথ্যেও উঠে এসেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ব্রিটেনও সৌদি তেলবাহী জাহাজে হুতিদের হামলা এবং সামুদ্রিক অবরোধের হুমকি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
তবে জুবাইলের বর্তমান ঘটনাকে হুতিদের ‘প্রথম বড় হামলা’ বলা ঠিক হবে না। অতীতেও সৌদির জ্বালানি পরিকাঠামো লক্ষ্য করে হুতিদের হামলার দাবি সামনে এসেছে। ২০১৯ সালে আবকাইক ও খুরাইসের তেল পরিশোধন পরিকাঠামোয় বড় হামলার পর হুতিরা দায় স্বীকার করেছিল, যদিও সেই দায় নিয়ে আন্তর্জাতিক তদন্তে বিতর্ক ছিল।
এর পাশাপাশি রবিবার সৌদি আরবের জিজান (Jazan) অঞ্চলে আরামকোর একটি স্থাপনাতেও আগুন লাগার খবর পাওয়া গিয়েছে। হুতিরা পরে জিজানের ওই স্থাপনায় ড্রোন হামলার দায় স্বীকার করেছে বলে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে; প্রাথমিকভাবে কোনও হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
এই আবহেই সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে নতুন সমীকরণ সামনে এসেছে। মক্কায় তিন দেশের মধ্যে যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরের খবরের পর পশ্চিম এশিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনা আরও বেড়েছে। চুক্তির মূল লক্ষ্য হিসেবে পারস্পরিক প্রতিরোধ ক্ষমতা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদারের কথা বলা হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সৌদি আরব ও পাকিস্তানের ক্ষেত্রে অবশ্য এর আগেই ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে একটি দ্বিপাক্ষিক ‘Strategic Mutual Defense Agreement’ স্বাক্ষরিত হয়েছিল, যেখানে এক দেশের বিরুদ্ধে আগ্রাসনকে উভয়ের বিরুদ্ধে আগ্রাসন হিসেবে বিবেচনা করার কথা বলা হয়েছিল।
সব মিলিয়ে, জুবাইলে বিস্ফোরণের ঘটনায় এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হামলার নেপথ্যে কে বা কারা। ইজরায়েলি সংবাদমাধ্যম ও আঞ্চলিক সূত্র হুতিদের দিকে আঙুল তুললেও সৌদি সরকারের আনুষ্ঠানিক তদন্ত বা দায় নির্ধারণের তথ্য এখনও সামনে আসেনি। ফলে পশ্চিম এশিয়ার এই নতুন উত্তেজনায় পরবর্তী কয়েক ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।



