সৌদিতে ড্রোন হামলায় ভারতে তেল সরবরাহ বন্ধ! বাড়বে পেট্রোল-ডিজেলের দাম, বাড়ছে উদ্বেগ

সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনে হামলার পর ভারতীয় শোধনাগারে অপরিশোধিত তেল সরবরাহে বিঘ্নের দাবি। হরমুজ ও বাব-এল-মান্দেবের পরিস্থিতিতে আমদানি খরচও বাড়ছে।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনে হামলার জেরে ভারতের তেল সরবরাহ ব্যবস্থায় নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে। সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলার পর সৌদি আরবের সরকারি তেল সংস্থা আরামকো ভারতীয় শোধনাগারগুলিতে অপরিশোধিত তেল সরবরাহ আপাতত বন্ধ রেখেছে বলে একাধিক সূত্রের দাবি। ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের গণ্ডি পেরিয়েছে। ফলে ভারতের মতো আমদানিনির্ভর দেশের জ্বালানি খরচ আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলের তৈলক্ষেত্র থেকে পশ্চিম উপকূলের ইয়ানবু বন্দরে অপরিশোধিত তেল পৌঁছে দেয় প্রায় ১,২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন। হরমুজ প্রণালী এড়িয়ে তেল পরিবহণের ক্ষেত্রে এই পাইপলাইন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প পথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

গত সপ্তাহে ইরান-সমর্থিত একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলায় পাইপলাইনের তেল সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে হরমুজ প্রণালী এবং বাব-এল-মান্দেব দিয়েও জাহাজ চলাচল ব্যাপক ভাবে ব্যাহত হওয়ায় পশ্চিম এশিয়া থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল পৌঁছনোর পথ আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

বৃহস্পতিবার সৌদি প্রশাসন ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনটি বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয় বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। একই সময়ে পশ্চিম সৌদি আরব ও লোহিত সাগর ঘিরে নিরাপত্তা ঝুঁকিও বেড়েছে। ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠীর কার্যকলাপের কারণে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে ভারতের উপর চাপটা আরও বেশি। কারণ দেশের মোট তেল ব্যবহারের প্রায় ৮৮ শতাংশই আমদানি করা অপরিশোধিত তেল থেকে আসে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ কমার আশঙ্কা তৈরি হলেই তার সরাসরি প্রভাব পড়ে ভারতের আমদানি খরচে।

পরিসংখ্যানেও সেই চাপের ছবি স্পষ্ট। চলতি বছরের এপ্রিল থেকে অগস্ট পর্যন্ত ভারতের অপরিশোধিত তেল আমদানির খরচ বেড়ে ৭,৪৮০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। আগের বছরের একই সময়ে এই খরচ ছিল ৫,০৪০ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আমদানি খরচ প্রায় ৪৮.৪ শতাংশ বেড়েছে।

অন্যদিকে, একই সময়ে দেশের অভ্যন্তরীণ অপরিশোধিত তেল উৎপাদনও কিছুটা কমেছে। এপ্রিল থেকে অগস্ট পর্যন্ত ভারত ১.১৪ কোটি মেট্রিক টন অপরিশোধিত তেল উৎপাদন করেছে, যেখানে গত বছরের একই সময়ে উৎপাদন ছিল ১.১৯ কোটি মেট্রিক টন। অর্থাৎ উৎপাদন কমেছে প্রায় ৫ লক্ষ মেট্রিক টন।

সৌদি আরবও ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী। প্রতিবেদনে উদ্ধৃত তথ্য অনুযায়ী, সংঘাত শুরুর পর থেকে ভারতের মোট অপরিশোধিত তেল আমদানির প্রায় ৯ শতাংশ সৌদি আরবের আরামকো থেকে এসেছে। এখন সেই সরবরাহে বিঘ্ন তৈরি হওয়ায় ভারতীয় শোধনাগারগুলিকে বিকল্প উৎস থেকে তেল সংগ্রহ করতে হতে পারে।

তেলের দাম নিয়ে ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক বাজারে উদ্বেগ বাড়ছে। ইরান-আমেরিকার সংঘাতের সময় ব্রেন্ট ক্রুডের দাম এক পর্যায়ে ব্যারেলপ্রতি ১১৯ ডলারে পৌঁছেছিল। পরে দাম কমলেও সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে ফের তা ১০০ ডলারের উপরে উঠতে শুরু করেছে। সৌদি তেল সরবরাহে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়াই এর অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।

শুধু অপরিশোধিত তেলের দাম নয়, দীর্ঘস্থায়ী সরবরাহ সংকট তৈরি হলে জাহাজভাড়া, বিমা এবং পরিবহণ খরচও বাড়তে পারে। একইসঙ্গে ডলারের তুলনায় টাকার উপর চাপ তৈরি হলে আমদানি করা তেলের প্রকৃত খরচ আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত জ্বালানি থেকে শুরু করে পরিবহণ ও অন্যান্য পণ্যের দামেও পড়তে পারে।

তবে এখনই পেট্রোল-ডিজেলের দাম কতটা বাড়বে, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। কারণ আন্তর্জাতিক অপরিশোধিত তেলের দাম, সরবরাহ পরিস্থিতি, ভারতীয় শোধনাগারগুলির বিকল্প উৎস থেকে তেল সংগ্রহ এবং দেশীয় জ্বালানির মূল্য নির্ধারণ—সবকিছুর উপর চূড়ান্ত প্রভাব নির্ভর করবে। কিন্তু সৌদি সরবরাহে দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্ন হলে ভারতের আমদানি ব্যয় যে আরও বাড়তে পারে, তা নিয়ে উদ্বেগ ইতিমধ্যেই তৈরি হয়েছে।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন