রাইট টু ডিসকানেক্ট বিল: অফিস সময়ের পর ফোন-ইমেল নয়, লোকসভায় পেশ হল নয়া বিল

লোকসভায় প্রাইভেট মেম্বার্স বিল পেশ করলেন সুপ্রিয়া সুলে। কাজের সময়ের বাইরে অফিসের ফোন বা ইমেল প্রত্যাখ্যানের অধিকার চাই কর্মীদের জন্য।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

ভারতে কর্মীদের কাজের পর ব্যক্তিগত সময় ক্রমশ ক্ষয়ে যাচ্ছে—কর্পোরেট চাপ, ওয়ার্ক-ফ্রম-হোম সংস্কৃতি এবং ডিজিটাল সংযোগের বাড়বাড়ন্তের ফলে অফিসের সীমা আর অফিসেই আটকে থাকে না। এই পরিস্থিতি থেকেই উঠে এসেছে রাইট টু ডিসকানেক্ট বিল পুনরায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। শুক্রবার লোকসভায় আবারও এই বিল পেশ করেছেন এনসিপি সাংসদ সুপ্রিয়া সুলে।

বিলে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, কাজের সময়ের বাইরে বা ছুটির দিনে কোনও কর্মী চাইলে অফিসের ফোন না ধরতে পারেন, এমনকি অফিসের ই-মেল বা মেসেজেরও জবাব দিতে বাধ্য নন। সুপ্রিয়া সুলের মতে, আধুনিক কর্মক্ষেত্রে কর্মীদের মানসিক চাপ ভয়াবহভাবে বাড়ছে। তাই তাঁদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সময় রক্ষার জন্য এই রাইট টু ডিসকানেক্ট বিল অত্যন্ত জরুরি।

রাইট টু ডিসকানেক্ট বিল: অফিস সময়ের পর ফোন-ইমেল নয়, লোকসভায় পেশ হল নয়া বিল

২০১৯ সালেও এই একই বিল সংসদে পেশ করেছিলেন সুপ্রিয়া সুলে, তবে তা আইনে পরিণত হয়নি। এবারও বিলটি একটি প্রাইভেট মেম্বার্স বিল, ফলে তা আইন হওয়ার সম্ভাবনা কম হলেও, বিলটি সংসদে পেশ হওয়ায় বিষয়টি নতুন করে জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে।

রাইট টু ডিসকানেক্ট বিল-এর মূল উদ্দেশ্য হল কর্মীদের উপর অনিয়ন্ত্রিত কাজের চাপ কমানো এবং কাজের সময়ের বাইরে তাঁদের স্বাধীনতা রক্ষা করা। বিশেষত বেসরকারি ও কর্পোরেট ক্ষেত্রের কর্মীরা সবচেয়ে বেশি এই সমস্যায় পড়েন। অফিস-টাইম শেষ হলেও ফোন, হোয়াটসঅ্যাপ, মেইল—সর্বত্র কাজের নির্দেশনা এসে পৌঁছয়, যা তাঁদের ব্যক্তিগত জীবনকে ব্যাহত করে।

সুলে বিলে যুক্তি দিয়েছেন, কর্মীরা যেহেতু কাজের জন্য নির্দিষ্ট সময় ও শ্রম ব্যয় করেন, তাই কাজের সময় শেষে তাঁদের অধিকার থাকা উচিত ডিজিটাল সংযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার। বিশ্বের বহু দেশে যেমন ফ্রান্স, ইতালি, স্পেনের মতো দেশে এই আইনের প্রয়োগ রয়েছে, ভারতেও সেই আলোচনা শুরু হওয়া জরুরি।

প্রাইভেট মেম্বার্স বিল সাধারণত সরকার নয়, পৃথক সাংসদরা ব্যক্তিগতভাবে পেশ করেন। সরকারের সমর্থন না পেলে এ ধরনের বিল আইন হয় না। ইতিহাস বলছে, স্বাধীনতার পর থেকে মাত্র একটি প্রাইভেট মেম্বার্স বিল আইন হয়েছে। ফলে রাইট টু ডিসকানেক্ট বিল সংসদে পাস হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। তবে কর্মীদের অধিকার নিয়ে এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে চর্চার ক্ষেত্র তৈরি করবে।

সরকারি দপ্তরের তুলনায় বেসরকারি সংস্থা, IT sector, corporate workplace–এ এই সমস্যাটা বেশি প্রকট। ওয়ার্ক-লাইফ ব্যালেন্স বজায় রাখতে এই বিলকে অনেক শ্রম আইন বিশেষজ্ঞও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন। তাঁদের মতে, এই বিল হয়তো এখনই আইন না হলেও, ভবিষ্যতে ভারতের শ্রমনীতিতে বড় পরিবর্তনের সূচনা ঘটাতে পারে।

অন্যদিকে, কর্পোরেট মহলের একটি অংশ আশঙ্কা প্রকাশ করে বলছে, রাইট টু ডিসকানেক্ট বিল প্রয়োগ হলে তা উৎপাদনশীলতা কমাতে পারে। তবে অধিকাংশ মানবসম্পদ বিশেষজ্ঞের মত, সুখী কর্মী মানেই উৎপাদনশীল কর্মী, তাই দীর্ঘমেয়াদে এই পদক্ষেপই বেশি বাস্তবসম্মত।

বর্তমান পরিস্থিতিতে, কর্মীদের জন্য সুপ্রিয়া সুলের বিল একটি বলিষ্ঠ বার্তা—কাজ গুরুত্বপূর্ণ হলেও, ব্যক্তিগত সময় ও মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্ব তার চেয়ে কোনও অংশে কম নয়।
বিলটি আইন হবে কি না, তা ভবিষ্যৎই বলবে। তবে রাইট টু ডিসকানেক্ট বিল নিঃসন্দেহে কর্মীদের অধিকারের প্রশ্নে একটি নতুন দিশা দেখাল।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহুর্তে। আমাদের ফলো করুন
Google News Google News

সদ্য প্রকাশিত