রাহুল গান্ধী। ভারতীয় রাজনীতির সাম্প্রতিক ইতিহাসে যার সম্ভাবনা প্রশ্নাতীত। কিন্তু, হয়তো কোথাও গিয়ে বিগত চার পাঁচ বছর আগে কিছুটা দিশা হারিয়ে ফেলেছিলেন তিনি। মাঝে মাঝেই রাজনীতির সঙ্গে তাঁর দূরত্ব বেড়ে যেত। যার খেসারতও তিনি দেন ২০১৯ সালে। আমেঠি থেকে লোকসভায় হারেন এবং পরবর্তীতে ওয়েনাড় থেকে জিতেও আসেন যদিও। রাহুলকে নিয়ে কম মশকরা হয়নি বিজেপি মহলে। ‘পাপ্পু’, ‘পাপ্পু’ বলে তাঁকে দমিয়ে দেওয়ার চেষ্টাও ছিল যথেষ্ট। এ হেন রাহুল গান্ধী ‘কামব্যাক’ করেন ‘ভারত জোড়ো’ যাত্রা দিয়ে। কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী পথ হাঁটেন। বুঝতে পারেন, বিরোধী পক্ষে নিজের প্রয়োজনীয়তা। অবশেষে, আজকের তারিখে রাহুল গান্ধী দেশের বিরোধী দলনেতা। ২০২৪ লোকসভায় রায়বরেলি ও ওয়েনাড় দুই কেন্দ্র থেকে সাড়ে ৩ লক্ষেরও বেশি ভোটে জেতা একজন কংগ্রেস সাংসদ।
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের অনেকেই একটা কথা স্বীকার করেন, আগের চেয়ে রাহুলের সক্রিয়তা অনেক বেড়েছে। সঙ্গে যেটা তাঁর ব্রক্ষাস্ত্র সেটা হল, গ্রহণযোগ্যতা। মুখের সেই সহজ হাসি, শরিক দলগুলিকে সমমর্যাদা দেওয়া এবং কোথাও গিয়ে দেশের স্বার্থে হার না মানা একটা মানসিকতা। ক্রমেই উত্তরণের মাধ্যমে রাজনীতির এক নতুন কক্ষপথে প্রবেশ করেছেন রাহুল। যেখানে ক্ষমতাসীন সরকারপক্ষ খুব স্পষ্টতই বুঝতে পারছে, এই রাহুল গান্ধীকে দমানো খুব সহজ হবে না!



বিরোধী দলনেতার ভূমিকায় সোমবার সংসদের বিশেষ অধিবেশনে প্রথম বক্তৃতা করলেন রাহুল গান্ধী। আলতো হাসির আড়ালে আজকাল যে আক্রমণাত্মক মেজাজকে তিনি লুকিয়ে রেখে অন্য সময় স্বাচ্ছন্দ্যে ঘোরাঘুরি করেন। এদিন তা বর্জন করলেন, হয়তো উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবেই। এক ঘন্টার ওপর ভাষণ দিলেন। বিগত পাঁচ বছরে দেশে ঘটে যাওয়া প্রায় সমস্ত বিষয়কে ছুঁয়ে যেতে যাইলেন। এবং, বিরোধী দলনেতার বক্তব্যে যে ভাষা স্ফুলিঙ্গ তৈরি হল, সেখানে কখনও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, কখনও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বা প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংহকে উঠে দাঁড়িয়ে বাধ্য হতে হল রাহুলকে থামাতে! তিনি থামলেন, সাময়িক, আবার শুরু করলেন, চিরকালীন?
‘Yes, Pappu CAN Dance Sala’, প্রথম বলে ১২ মারলেন রাহুল!

মাঝে স্পিকার নির্বাচনের দিন পাঞ্জাবি পড়ে লোকসভায় আসেন রাহুল। কিন্তু, এদিন ফিরে গেলেন নিজের পরিচিত সাদা গেঞ্জি এবং গাঢ় নীল প্যান্টে। তবে, যেখানে ফিরে গেলেন না তা হল, সেই নরমপন্থী মেজাজে। সেই মেজাজকে বর্জন করে একজন ‘প্রকৃত’ বিরোধী দলনেতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন তিনি। এটা অবশ্য ঠিক, এবার তাঁর সঙ্গে রয়েছেন আরও ২৩৯ জন সাংসদ, যারা রাহুলকে আরও খানিকটা প্রশ্রয় দিলেন।


এদিন রাহুল বারংবার বলে গেলেন, একটা ভয়ের কথা। তাঁর মতে, গোটা দেশজুড়ে একটা ভয়ের পরিবেশ তৈরি করেছে এনডিএ সরকার। নির্বাচনের আগে ইডি-সিবিআই লেলিয়ে বিরোধী নেতানেত্রীদের ভয় দেখানো, ধর্মের নামে সাধারণ মানুষকে ভয় দেখানো, ব্যক্তিস্বাধীনতাকে নিয়ন্ত্রণ করে ভয় দেখানো, এমনকি সীমান্তরক্ষাকারী জওয়ানদের বুকেও ভয়ের সঞ্চার হয়েছে বিগত কয়েক বছরে। রাহুল প্রশ্ন তুললেন অগ্নিবীরদের নিয়ে। তিনি বললেন, ছয় মাসের ট্রেনিং নিয়ে একজন জওয়ান কীভাবে পাঁচ বছরের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চিনা জওয়ানের মোকাবিলা করবে? সেই সঙ্গে বিশেষভাবে রাহুল যেটা তুলে ধরলেন সেটা হল, হিন্দুত্ব ইস্যু।
হিন্দুত্বের ধ্বজা উড়িয়ে যে এবারের লোকসভা নির্বাচনে আখেড়ে কিছুই লাভ হয়নি তা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে বিজেপি। যে অযোধ্যায় রামমন্দির তৈরি হল, সেখানের লোকসভা কেন্দ্র ফৈজাবাদে পদ্ম-শিবির হারল ৫০ হাজারের বেশি ভোটে! বিজেপির লাল্লু সিংহকে হারালেন সমাজবাদী পার্টির অবধেশ প্রসাদ। রাহুল সরাওসরি নরেন্দ্র মোদিকে কটাক্ষ করে বললেন, “মোদিজীর প্ল্যান ছিল অযোধ্যায় দাঁড়াবেন। কিন্তু, তাঁকে ভোটকুশলীরা পরামর্শ দেন, এটা করবেন না। অযোধ্যা আপনার পাশে নেই। সেখা গেল তাই। অযোধ্যায় হারল বিজেপি। আর বারাণসীতে কোনও ক্রমে জিতলেন মোদিজি!”
রাহুলের বক্তব্যের যে অংশটার পরে লোকসভায় সবচেয়ে বেশি হইচই হল সেই প্রসঙ্গে আসা যাক। তিনি মনে করেন, বিজেপির প্রতিনিধিরা হিন্দুত্বের নামে হিংসা ছড়াচ্ছেন! এই মন্তব্যেই তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠেন প্রধানমন্ত্রী। রাহুলকে থামিয়ে স্পিকারের উদ্দেশ্যে মোদি বলেন, “এটা একটা গম্ভীর বিষয়। এটা নিয়ে বিরোধী দলনেতার এই মন্তব্য সঠিক নয়।” অমিত শাহও সেই সুরে সুর মিলিয়ে বলেন, “এটা গোটা হিন্দু জাতির অপমান। দেশের কোটি কোটি মানুষ নিজেকে গর্বের সঙ্গে হিন্দু বলে থাকেন।”
রাহুল এই বিষয়টা থেকে এগিয়ে একটা যুক্তিপূর্ণ বিষয়কে সামনে নিয়ে আসেন। সেটা হল, ‘অভয় মুদ্রা’। অর্থাৎ, কংগ্রেসের যে প্রতীক। সহজে বলতে গেলে, আশীর্বাদের যে মুদ্রা। বিরোধী দলনেতা সঙ্গে করেই নিয়ে গিয়েছিলেন শিব, গুরু নানক, যিশু খিস্ট, হজরত মহম্মদের ছবি। সেইগুলো দেখিয়ে রাহুল দাবি করেন, প্রত্যেকেই অভয় মুদ্রা দেখাচ্ছেন। এটা ভারতের সংস্কৃতি। সর্বধর্মের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটা দেশ যেখানে আলাদা করে হিন্দুত্বের দেখনদারির প্রয়োজন নেই। তীব্র ভাষায় তিনি নরেন্দ্র মোদিদের উদ্দেশ্যে বলে দেন, “এই বিজেপি-আরএসএস কেউ হিন্দু নয়!”

সরগরম হয়ে ওঠেন লোকসভা। রাহুলের পরিকল্পনা ছিলই। তিনি যতটা বলতে এসেছেন সেটা বলে যাবেনই! মাঝে অবশ্য একবার মাইক বন্ধের অভিযোগও ওঠে। তাঁর বলার সময় নেপথ্যে ‘ইন্ডিয়া’ সাংসদরা ‘শেম’ ‘শেম’ বলে মহলকে বিজেপি নেতাদের সহ্যাতীত করে তুলছিলেন। নরেন্দ্র মোদির মুখও ছিল ভার! তবে হ্যাঁ, রাহুল গান্ধী নিজের এই সত্তাকে কতদিন ধরে নিয়ে যাবেন এবং আগামী লোকসভায় তিনি সরাসরি প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হবেন কিনা সেদিকেই নজর রয়েছে রাজনৈতিক মহলের। তবে, রাহুল একটা ঘোষণা করলেন, তিনি শুধু এই মুহূর্তে কংগ্রেস সাংসদ নন, তিনি বিরোধী দলনেতা, মানে, অন্যান্য প্রতিটি বিজেপি বিরোধী দলের প্রতিনিধি, সর্বোপরি দেশের সমস্ত বিরোধী ভোটারের জোরালো কন্ঠস্বর!







