নদিয়ার তাহেরপুরে শনিবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সভাকে ঘিরে রাজ্য বিজেপির প্রত্যাশা ছিল বহুস্তরীয়। প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক—দু’টি সভা মিলিয়ে অন্তত ৭৫ মিনিট প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতি ধরে রেখেই তৈরি হয়েছিল গোটা রূপরেখা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আবহাওয়ার বাধায় সেই কর্মসূচি ভেঙে পড়ল। তাহেরপুরে পৌঁছনো তো দূরের কথা, কলকাতা বিমানবন্দর ছাড়িয়ে এগোতেই পারলেন না প্রধানমন্ত্রী। ফলে পশ্চিমবঙ্গ সফর সারতে হল মাত্র ১৬ মিনিটে, তাও ফোনে দেওয়া ভাষণে।
ঘন কুয়াশার কারণে হেলিকপ্টার তাহেরপুরে অবতরণ করতে না পারায় সেটি কলকাতা বিমানবন্দরেই ফিরে আসে। শেষ পর্যন্ত সেখান থেকেই সভায় উপস্থিত জনতার উদ্দেশে বক্তব্য রাখেন প্রধানমন্ত্রী। ভাষণের শুরুতেই তিনি পরিস্থিতির জন্য ক্ষমা চান এবং সভাস্থলে যাওয়ার পথে রেল দুর্ঘটনায় নিহত বিজেপি কর্মীদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান।
তবে তাহেরপুরের মাঠে জমায়েত হওয়া হাজার হাজার মানুষ প্রধানমন্ত্রীকে দেখতে পেলেন না—শুধু শুনলেন তাঁর কণ্ঠস্বর। রাজ্য বিজেপির প্রথম সারির নেতারা মঞ্চে উপস্থিত থাকলেও পরিস্থিতির অস্বস্তি চাপা থাকেনি।
প্রত্যাশা ছিল এসআইআর নিয়ে বার্তা, মিলল না আশ্বাস
এই সভা ঘিরে বিজেপির অন্যতম বড় রাজনৈতিক লক্ষ্য ছিল মতুয়া সমাজে তৈরি হওয়া এসআইআর (Special Intensive Revision) সংক্রান্ত উদ্বেগে প্রধানমন্ত্রীর স্পষ্ট বার্তা। নদিয়া ও সংলগ্ন এলাকায় ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, তা নিরসনে মোদীর বক্তব্য শোনা যাবে—এমনই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন সভার আগের বক্তা, রাজ্য বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য।
কিন্তু সংক্ষিপ্ত ভাষণে এসআইআর নিয়ে কোনও নির্দিষ্ট আশ্বাস দেননি প্রধানমন্ত্রী। মতুয়া প্রসঙ্গে তিনি হরিচাঁদ, গুরুচাঁদ ও বড়মার অবদানের কথা স্মরণ করেন এবং বলেন,
মতুয়া সমাজ চিরকাল সমাজকল্যাণের পথ দেখিয়েছে।
এর বাইরে ভোটার তালিকা বা এসআইআর নিয়ে কোনও স্পষ্ট ব্যাখ্যা বা আশ্বাস মেলেনি।


রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই নীরবতা মতুয়া সমাজের উদ্বেগ কতটা প্রশমিত করতে পারল, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
‘বঙ্কিমদা’ নয়, এ বার ‘বঙ্কিমবাবু’
তবে ভাষণে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন নজর কেড়েছে। অতীতে পশ্চিমবঙ্গে এসে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে ‘বঙ্কিমদা’ বলে সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। শনিবার সেই ভুল শুধরে তিনি বলেন,
“এই মাটি দেশকে দিয়েছে ঋষি বঙ্কিমবাবুর মতো মহান চিন্তক।”

‘বন্দে মাতরম’ প্রসঙ্গে মোদীর বক্তব্য, ঊনবিংশ শতকে এই গান ছিল দাসত্ব থেকে মুক্তির মন্ত্র, আর একুশ শতকে তা হওয়া উচিত রাষ্ট্র নির্মাণের প্রেরণা।
উন্নয়ন বনাম ‘মহাজঙ্গলরাজ’
১৬ মিনিটের ভাষণের বড় অংশ জুড়েই ছিল উন্নয়নের রাজনৈতিক বয়ান। বিহার বিধানসভা নির্বাচনের ফল টেনে প্রধানমন্ত্রী দাবি করেন, উন্নয়নের কারণেই দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থেকেও বিজেপি জনসমর্থন পেয়েছে।
তার পরেই পশ্চিমবঙ্গকে নিশানা করে বলেন,
“বিহার জঙ্গলরাজকে প্রত্যাখ্যান করেছে। পশ্চিমবঙ্গে এখন মহাজঙ্গলরাজ চলছে।”
ত্রিপুরার উদাহরণ টেনে মোদীর বক্তব্য, বাম শাসনের অবসানের পর ত্রিপুরা এগিয়েছে, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে বামেদের খারাপ দিক তৃণমূল আত্মস্থ করেছে—ফলে রাজ্য এগোতে পারছে না।
‘গো ব্যাক মোদী’ প্রসঙ্গ ও অনুপ্রবেশ ইস্যু
নদিয়া জেলায় জাতীয় সড়কের ধারে দেখা গিয়েছে ‘গো ব্যাক মোদী’ লেখা ব্যানার। সেই প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গণতন্ত্রে হার-জিত থাকবেই, কিন্তু ‘গো ব্যাক ঘুসপেটিয়া’ বলার সাহস নেই। তৃণমূল অনুপ্রবেশকারীদের রক্ষা করতেই এসআইআর-এর বিরোধিতা করছে—এমন অভিযোগও করেন তিনি।
আবহাওয়া নিয়েও রাজনৈতিক ইঙ্গিত
ভাষণের শেষ দিকে আবহাওয়ার প্রসঙ্গ টেনে নাম না করে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কটাক্ষ করেন মোদী। বলেন, তিনি আবহাওয়াকেও রাজনীতির রং দেন না—যা রাজনৈতিক মহলের মতে, অতীতে মমতার করা অভিযোগেরই পাল্টা বার্তা।
‘জয় নিতাই’ দিয়ে শুরু, সেখানেই আবেগ
নদিয়া বৈষ্ণব আন্দোলনের পীঠস্থান হওয়ায় ভাষণের শুরুতেই ‘জয় নিতাই’ উচ্চারণ করেন প্রধানমন্ত্রী। চৈতন্য মহাপ্রভু ও নিতাইয়ের প্রসঙ্গ টেনে ভাষণের আবেগী পরিসমাপ্তি করেন তিনি।








