দক্ষিণ এশিয়ার সামরিক শক্তির ভারসাম্যে নতুন সমীকরণ তৈরি হতে চলেছে। পাকিস্তানকে সবচেয়ে আধুনিক ‘আকাশ থেকে আকাশ’ ক্ষেপণাস্ত্র (AIM-120D-3) দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ট্রাম্প প্রশাসনের এই পদক্ষেপে ভারতীয় প্রতিরক্ষা মহলে স্পষ্ট উদ্বেগ ছড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কার্যকর হলে পাকিস্তানের বিমান প্রতিরক্ষা ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে।
পেন্টাগনের এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরকারের অনুমোদনের পর ইসলামাবাদকে দেওয়া হবে AIM-120D-3 মডেলের উন্নত Air-to-Air Missile। এটি ৩০ সেপ্টেম্বরের পাক-মার্কিন প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তির অংশ, যা অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্রগুলির সরবরাহ সম্পন্ন হবে।
এই AIM-120D-3 মিসাইল হল মধ্যপাল্লার সবচেয়ে আধুনিক ‘আকাশ থেকে আকাশ’ ক্ষেপণাস্ত্র, যা মূলত শত্রুপক্ষের যুদ্ধবিমান ধ্বংস করার জন্য ডিজাইন করা। এটি যুক্তরাষ্ট্রের রেথিয়ন সংস্থা তৈরি করেছে। চার দশক আগে এফ-১৬ যুদ্ধবিমান কেনার পর এই প্রথমবার পাকিস্তান এতটা উন্নত মার্কিন প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম পাচ্ছে।
পাকিস্তানকে সবচেয়ে উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র দিচ্ছে আমেরিকা, ভারতকে চাপে রাখতে নয়া উদ্যোগ ট্রাম্পের

এই মিসাইল সংযোজনের ফলে পাকিস্তানের F-16 যুদ্ধবিমানগুলির আক্রমণ ও প্রতিরক্ষা ক্ষমতা নতুন মাত্রা পাবে। রেথিয়নের তৈরি এই ক্ষেপণাস্ত্র ১৬০ কিমি পর্যন্ত দূরত্বে শত্রু বিমানে আঘাত হানতে সক্ষম, যা দক্ষিণ এশিয়ার সামরিক পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের কৌশলগত অবস্থানকে মজবুত করবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপ ভারত-পাকিস্তান শক্তির ভারসাম্যে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। ভারতের প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক মহলে মত, পাকিস্তান যদি AIM-120D-3 ক্ষেপণাস্ত্র হাতে পায়, তবে আকাশযুদ্ধে পাকিস্তানি বিমানবাহিনী একধাপ এগিয়ে যাবে। বিশেষত সীমান্তবর্তী অঞ্চলে এটি ভারতীয় বিমানবাহিনীর জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে।
ঘটনাচক্রে, সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে পাক প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। সেখানেই এই পাক-মার্কিন প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে চূড়ান্ত আলোচনা হয়। বৈঠকের পর ট্রাম্প ঘোষণা করেন, “দক্ষিণ এশিয়ায় স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ইসলামাবাদের সঙ্গে কৌশলগত সহযোগিতা বাড়ানো প্রয়োজন।”
এই সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক তাৎপর্যও কম নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমেরিকা ধীরে ধীরে পাকিস্তানের প্রতি কূটনৈতিকভাবে নরম মনোভাব দেখাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের পাল্টা কৌশল হিসেবেই দেখা উচিত। পাকিস্তান চীনের ঘনিষ্ঠ মিত্র হওয়ায়, ওয়াশিংটন ইসলামাবাদের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা বাড়িয়ে চীনের দক্ষিণ এশীয় প্রভাব রোধে কৌশলগত ভারসাম্য তৈরি করতে চাইছে।
এপ্রিল মাসে পহেলগাঁও হত্যাকাণ্ডের পর মে মাসে ভারতীয় সেনা পাকিস্তানের জঙ্গিঘাঁটিতে ‘অপারেশন সিঁদুর’ চালায়। টানা চারদিনের সংঘর্ষের পর দুই দেশ অস্ত্রসংবরণে সম্মত হয়। ট্রাম্প দাবি করেন, তাঁর কূটনৈতিক হস্তক্ষেপেই ভারত ও পাকিস্তান যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে। যদিও ভারত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে মার্কিন হস্তক্ষেপের দাবি খারিজ করেছে।
ভারতীয় কূটনৈতিক মহল মনে করছে, এই ক্ষেপণাস্ত্র চুক্তির মাধ্যমে আমেরিকা পাকিস্তানকে কৌশলগতভাবে কাছে টানার চেষ্টা করছে। এর ফলে ভারতকে তার প্রতিরক্ষা নীতি ও আকাশ প্রতিরক্ষা কৌশলে নতুন করে হিসাব কষতে হবে।
বর্তমানে ভারত Astra Missile, Rafale-এর Meteor Missile এবং S-400 এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম দিয়ে নিজের আকাশ প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করছে। তবে পাকিস্তানের হাতে AIM-120D-3 গেলে ভারতের আকাশ প্রতিরক্ষা কৌশলে বাড়তি চাপ পড়বে, বিশেষত পশ্চিম সীমান্তে।
এই পরিস্থিতিতে ভারত কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে, সেটাই এখন দেখার। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের একাংশের দাবি, ভারতকে এখন তার দেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি ও এয়ার কমব্যাট প্রস্তুতি আরও উন্নত করতে হবে। পাশাপাশি, কূটনৈতিক স্তরেও ওয়াশিংটনের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়ে পাকিস্তান-মার্কিন ঘনিষ্ঠতার প্রভাব কমানোর চেষ্টা করা জরুরি।



