উলুবেড়িয়ায় মর্মান্তিক পুলকার দুর্ঘটনায় তিন স্কুলছাত্রছাত্রীর মৃত্যু রাজ্যজুড়ে ক্ষোভ ও উদ্বেগ বাড়িয়েছিল। এর পরেই কড়া পদক্ষেপ নিল রাজ্য সরকার। পরিবহণ দপ্তর সোমবার প্রকাশ করল পুলকার নিয়ে নয়া গাইডলাইন, যা স্কুল বাস, পুলকার পরিচালন সংস্থা, মালিক, অভিভাবক এবং স্কুল—এই পাঁচ পক্ষের উপরই সমানভাবে দায়িত্ব অর্পণ করেছে।
পরিবহণমন্ত্রী স্নেহাশিস চক্রবর্তী এদিন পুলিশ, পুলকার সংগঠন এবং প্রশাসনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন। তাঁদের মতামত নিয়েই তৈরি হয়েছে এই পুলকার নিয়ে নয়া গাইডলাইন, যা না মানলে কড়া প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে সরকার।


পুলকার নিয়ে রাজ্যের নয়া গাইডলাইন, ছাত্রছাত্রীদের সুরক্ষায় কড়া নজরদারি
নতুন গাইডলাইনে স্পষ্ট বলা হয়েছে, কোনও যানবাহন স্কুল ডিউটিতে নামতে পারবে না যদি তার বাণিজ্যিক পারমিট, আপডেটেড ফিটনেস ও বিমা না থাকে। গাড়ির ব্রেক, স্টিয়ারিং, টায়ার ও ইঞ্জিনের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ বাধ্যতামূলক। পরিবহণ দপ্তর ও পুলিশ যৌথভাবে এ বিষয়ে নজরদারি চালাবে।
গাইডলাইন অনুযায়ী স্কুল বাসকে নির্দিষ্ট রংয়ে রাঙানো হবে। গাড়ির সামনে ‘On School Duty’ বোর্ড লাগানো বাধ্যতামূলক। জানালায় গ্রিল, দরজায় নিরাপদ লক এবং চলাচলের সময় গাড়ির আলো জ্বালিয়ে রাখা—সবই এখন আইনসিদ্ধ নির্দেশ। কালো কাচ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে, কারণ তা নিরাপত্তা ও নজরদারিতে বাধা সৃষ্টি করে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলির একটি হল প্রতিটি যানে সিটবেল্ট বাধ্যতামূলক করা। গাড়িতে থাকতে হবে জিপিএস সিস্টেম, সক্রিয় প্যানিক বাটন, অগ্নিনির্বাপক ও ফার্স্ট এইড কিট। গাইডলাইন বলছে, প্রতিটি স্কুল গাড়িতে একজন অ্যাটেনড্যান্ট থাকতে হবে, সম্ভব হলে মহিলা, যিনি ছাত্রছাত্রীদের ওঠা–নামায় সহায়তা করবেন।



অন্যদিকে, চালকের ক্ষেত্রে কঠোর নিয়ম বেঁধে দেওয়া হয়েছে। আগে যাঁদের বিরুদ্ধে ওভারস্পিডিং, মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানো বা ট্র্যাফিক আইন ভাঙার অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে, তাঁরা আর স্কুল গাড়ি চালাতে পারবেন না। গাইডলাইন অনুযায়ী স্কুল পরিবহণে গতি সীমা ঘণ্টায় ৪০ কিমি।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকেও বড় দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। স্কুলকে নিয়মিত পুলকার ও বাস রক্ষণাবেক্ষণ শিবির আয়োজন করতে হবে। কোন কোন গাড়ি স্কুলে চলাচল করছে তার একটি হালনাগাদ তালিকা রাখতে হবে এবং অভিভাবকদের অনুরোধ করতে হবে শুধুমাত্র নথিভুক্ত পুলকার ব্যবহার করতে।
গাইডলাইন আরও বলছে, প্রতিটি স্কুলে একজন পরিবহণ আধিকারিক নিয়োগ করতে হবে, যিনি সমস্ত গাড়ির নথি সংরক্ষণ করবেন। গাড়ির ভিতরে- বাইরে লেখা থাকবে পরিবহণ আধিকারিকের নাম, তাঁর ফোন নম্বর এবং চাইল্ড হেল্পলাইনের ১০৯৮ নম্বর।
পরিবহণমন্ত্রী স্নেহাশিস চক্রবর্তী বলেন, “বেআইনি পুলকার পরিষেবা বন্ধ করতে এবং ছাত্রছাত্রীদের জীবন বাঁচাতে এই গাইডলাইন অত্যন্ত জরুরি।”
রাজ্য সরকারের এই কঠোর পদক্ষেপে অভিভাবকদের মধ্যে স্বস্তি তৈরি হয়েছে, যদিও অনেকেই মনে করছেন বাস্তব প্রয়োগই হবে আসল পরীক্ষা। কারণ, শুধু নিয়ম নয়, তা কঠোরভাবে মানানোর মাধ্যমে স্কুল পরিবহণ ব্যবস্থাকে নিরাপদ করা সম্ভব।
এখন দেখার, পুলকার নিয়ে নয়া গাইডলাইন বাস্তবে কত দ্রুত প্রয়োগ করা হয় এবং তা কি আদৌ দুর্ঘটনার সংখ্যা কমাতে সক্ষম হয়।








