দিল্লির যন্তর মন্তরে বিক্ষোভ, পুলিশের ব্যারিকেডের সামনে প্রতিবাদ আর তরুণদের জমায়েতে জোরালো বক্তৃতা—ছাত্র আন্দোলনের নতুন পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছেন নেহা বোরা (Neha Bora)। জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের (Jawaharlal Nehru University বা JNU) গবেষক নেহা অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (All India Students’ Association বা AISA) সর্বভারতীয় সভানেত্রী। নাটক ও অভিনয়ের জগৎ থেকে রাজনীতি এবং ছাত্র আন্দোলনে তাঁর আসার পথ তৈরি হয়েছে দীর্ঘ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে। আর সেই রাজনৈতিক বোধ গড়ে ওঠার কাহিনিতে রয়েছে বাংলারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।
নেহার রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয়নি কোনও নির্বাচনী মঞ্চ থেকে। তাঁর নিজের বক্তব্য অনুযায়ী, নাটক তাঁকে রাজনীতিকে অন্য চোখে দেখতে শিখিয়েছে। মঞ্চে অভিনয় ও পথনাটকের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে তিনি বুঝতে শুরু করেন, রাজনীতি শুধু দল, ভোট কিংবা ক্ষমতা দখলের লড়াই নয়। শিক্ষা, কাজের সুযোগ, সামাজিক মর্যাদা এবং সাধারণ মানুষের অধিকার—দৈনন্দিন জীবনের এই বিষয়গুলিও রাজনীতির সঙ্গে গভীর ভাবে জড়িত। সেই উপলব্ধিই তাঁকে ধীরে ধীরে ছাত্র রাজনীতি ও আন্দোলনের দিকে নিয়ে যায়।
নেহা উত্তরাখণ্ডের খাতিমার বাসিন্দা। তাঁর বেড়ে ওঠা হয়েছে সেনাবাহিনীর সঙ্গে যুক্ত একটি পরিবারে, ফলে দেশের বিভিন্ন জায়গায় থাকার অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। পড়াশোনার সূত্রে দিল্লি ও পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গেও তাঁর যোগ তৈরি হয়। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক হওয়ার পর ডক্টর বি আর আম্বেডকর বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা নেন তিনি। পরে জেএনইউ-তে থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজে গবেষণা শুরু করেন। অভিনয় ও নাট্যচর্চার সঙ্গে এই শিক্ষাগত যোগই তাঁর পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।

বাংলার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক শুধুই পড়াশোনার পর্বে সীমাবদ্ধ নয়। নেহা একাধিকবার বলেছেন, বাংলার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিসর তাঁর চিন্তাভাবনাকে প্রভাবিত করেছে। চারু মজুমদার, পাবলো নেরুদা এবং অরুন্ধতী রায়ের মতো ব্যক্তিত্ব ও লেখকদের সঙ্গে পরিচয়ের প্রসঙ্গও তিনি টেনেছেন। তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে, বাংলার ইতিহাস, সাহিত্য ও রাজনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গে পরিচয় তাঁকে দক্ষিণপন্থী রাজনীতির প্রতি সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে।
জেএনইউ-তে পড়াশোনার সময় বামপন্থী ছাত্র সংগঠন আইসার সঙ্গে যুক্ত হন নেহা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ফি বৃদ্ধি, শিক্ষার বেসরকারিকরণ, হস্টেলের সমস্যা এবং মহিলাদের নিরাপত্তার মতো বিষয় নিয়ে সংগঠনটির আন্দোলনে অংশ নেন তিনি। ক্রমে সংগঠনের নেতৃত্বে উঠে আসেন এবং সর্বভারতীয় সভানেত্রীর দায়িত্ব পান। ছাত্রছাত্রীদের দৈনন্দিন সমস্যাকে বৃহত্তর নীতি ও অধিকার সংক্রান্ত প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করাই তাঁর রাজনৈতিক কাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
২০২৬ সালে নিট (NEET) পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ ঘিরে দিল্লির যন্তর মন্তরে আন্দোলনে অংশ নিয়ে জাতীয় স্তরে আরও পরিচিতি পান নেহা। পরীক্ষাব্যবস্থার স্বচ্ছতা, শিক্ষার্থীদের অধিকার এবং শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে হওয়া প্রতিবাদে তিনি সক্রিয় ছিলেন। এর আগে শিক্ষা ও ছাত্রস্বার্থের বিভিন্ন দাবিতে তাঁর দীর্ঘ অনশনও আলোচনায় এসেছিল। সোনম ওয়াংচুকের সঙ্গে ২৩ দিনের অনশনে অংশ নেওয়ার ঘটনাও তাঁর আন্দোলন-জীবনের উল্লেখযোগ্য অধ্যায়।
এর পর ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর (Special Intensive Revision বা SIR) এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনেও সামনের সারিতে দেখা যায় তাঁকে। ১০ অক্টোবর দিল্লিতে ককরোচ জনতা পার্টির (Cockroach Janta Party বা CJP) ডাকা বিক্ষোভে যোগ দিতে গিয়ে নেহা ও তাঁর সহযোগীরা পুলিশের বাধার মুখে পড়েন। ওই কর্মসূচিকে ঘিরে একাধিক আন্দোলনকারীকে আটক করা হয়। ভোটার তালিকা সংশোধনের ফলে যোগ্য ভোটারদের অধিকার ক্ষুণ্ণ হওয়ার আশঙ্কা তুলে আন্দোলনকারীরা প্রতিবাদ করেন; নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তাঁরা।
নেহার রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে বিতর্কও কম নয়। তিনি প্রকাশ্যে কেন্দ্রীয় সরকার, বিজেপি এবং রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের (RSS) সমালোচনা করেছেন। তাঁর বক্তব্য, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ পরিবেশ বজায় রাখা জরুরি। পশ্চিমবঙ্গেও বিভিন্ন ছাত্রসভা ও বামপন্থী কর্মসূচিতে যোগ দিয়ে তিনি তরুণদের আন্দোলনে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যকে ঘিরে রাজনৈতিক মতভেদ থাকলেও ছাত্র আন্দোলনের সাম্প্রতিক পরিসরে নেহা বোরা এখন একটি পরিচিত নাম।
নাটকের মঞ্চ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগার, সেখান থেকে ছাত্র সংগঠনের নেতৃত্ব এবং রাস্তায় প্রতিবাদ—নেহা বোরার যাত্রাপথে এই পর্বগুলি একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত। তাঁর উত্থান দেখিয়েছে, ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্ব শুধু রাজনৈতিক দলের পরিচিত মুখদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক চর্চা ও অধিকারভিত্তিক আন্দোলন থেকেও নতুন নেতৃত্ব সামনে আসতে পারে।



