কলকাতা: দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের অবসান ঘটিয়ে মুকুল রায়ের বিধায়ক পদ খারিজ করল কলকাতা হাইকোর্ট (Kolkata High Court)। কৃষ্ণনগর উত্তর কেন্দ্র থেকে ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে BJP টিকিটে জেতা মুকুল রায় পরে তৃণমূল কংগ্রেসে (TMC) ফিরে আসেন। এরপর থেকেই শুরু হয় তাঁর বিধায়ক পদ নিয়ে বিতর্ক, যা অবশেষে হাইকোর্টের রায়ে নতুন মোড় নিল।
বৃহস্পতিবার বিচারপতি দেবাংশু বসাকের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ রায় দেয় যে, সংবিধানের ১০ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দলবদলের পর মুকুল রায়ের বিধায়ক পদ বাতিল হবে। এই মামলাটি দায়ের করেছিলেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari), যিনি দাবি করেছিলেন যে মুকুল রায় বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির প্রতীক ব্যবহার করে জিতে পরে দলবদল করেছেন।
মামলার পটভূমি:
২০২১ সালের মে মাসে বিজেপির প্রার্থী হিসেবে জয়ের পর মুকুল রায় ১১ জুন তৃণমূল ভবনে আনুষ্ঠানিকভাবে দলবদলের ঘোষণা করেন। সেই সময় তাঁর পাশে ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।
এরপর বিজেপি বিধানসভায় অভিযোগ করে, এই পদক্ষেপ সংবিধান লঙ্ঘন। শুভেন্দু অধিকারী স্পিকারের কাছে আবেদন করেন মুকুল রায়ের বিধায়ক পদ খারিজের। কিন্তু স্পিকার সেই আবেদন খারিজ করে দেন এবং মুকুল রায়কে বিধায়ক হিসেবে বহাল রাখেন।
এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধেই শুভেন্দু অধিকারী কলকাতা হাইকোর্টে মামলা দায়ের করেন। বৃহস্পতিবার সেই মামলার রায়ে হাইকোর্ট স্পিকারের সিদ্ধান্ত বাতিল করে জানায়, দলবদলকারী বিধায়কের পদ সংবিধান অনুসারে খারিজ হবে।
বিচারপতির পর্যবেক্ষণ:
বিচারপতি দেবাংশু বসাক বলেন, “সংবিধানের ১০ নম্বর অনুচ্ছেদ দলত্যাগের বিরুদ্ধে পরিষ্কার নির্দেশ দেয়। একজন নির্বাচিত প্রতিনিধি দলবদল করলে তাঁর বিধায়ক পদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়।” আদালত আরও নির্দেশ দেয়, রাজ্যের বিধানসভা সচিবালয় যেন দ্রুত এই রায়ের কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করে।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া:
রায়ের পর বিজেপি শিবিরে উচ্ছ্বাস দেখা দিয়েছে। শুভেন্দু অধিকারী বলেন, “এটা সংবিধান ও গণতন্ত্রের জয়। দলবদল করে কেউ জনগণের রায়কে অগ্রাহ্য করতে পারে না।” অন্যদিকে, তৃণমূল সূত্রে জানানো হয়েছে, রায় বিস্তারিত না দেখে তারা মন্তব্য করতে চায় না।
মুকুল রায়ের রাজনৈতিক যাত্রা:
তৃণমূল কংগ্রেসের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে মুকুল রায় একসময় ছিলেন দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক। ২০১৭ সালে তিনি TMC ছেড়ে BJP-তে যোগ দেন। ২০২০ সালে বিজেপির সর্বভারতীয় সহ-সভাপতির দায়িত্ব পান। তবে একুশের ভোটের পরপরই তৃণমূলে ঘর ওয়াপসি করেন তিনি।
তাঁর ঘরফেরার পর থেকেই রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন ওঠে—তিনি আসলে কোন দলের প্রতিনিধি? যদিও মুকুল রায়ের আইনজীবী বারবারই দাবি করেন, “তিনি কখনও আনুষ্ঠানিকভাবে দলবদল করেননি।” তবে হাইকোর্টের রায়ে সেই যুক্তি টেকেনি।
বিধানসভা ও রাজ্য রাজনীতিতে প্রভাব:
এই রায় শুধু মুকুল রায়ের জন্য নয়, পশ্চিমবঙ্গ রাজনীতিতে দলত্যাগের সংস্কৃতি নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করল। বিশেষজ্ঞদের মতে, আদালতের এই নির্দেশ ভবিষ্যতে অন্য দলবদলকারীদের ক্ষেত্রেও নজির হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।



