ইরানের হামলায় স্তব্ধ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল শোধনাগার, কাতার থেকে সরানো হল ১০০০ ভারতীয়কে

ইরান–আমেরিকা সংঘাতের আঁচে উত্তপ্ত গালফ অঞ্চল। কাতার থেকে ১০০০ ভারতীয় সরানো হয়েছে, ড্রোন হামলায় থেমেছে ইউএইর রুওয়াইস রিফাইনারি, বিশ্ব তেল বাজারে শুরু হয়েছে অস্থিরতা।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

মধ্যপ্রাচ্যে দ্রুত জটিল হয়ে উঠছে পরিস্থিতি। ইরান–আমেরিকা–ইজরায়েল সংঘাতের প্রভাব এখন সরাসরি ছড়িয়ে পড়েছে উপসাগরীয় দেশগুলিতে। কাতার থেকে প্রায় এক হাজার ভারতীয় নাগরিককে জরুরি ভিত্তিতে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে ড্রোন হামলার পর সংযুক্ত আরব আমিরশাহির বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ রুওয়াইস তেল শোধনাগারের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে ইরান গালফ অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালানোর হুমকি বাড়িয়েছে, যার প্রভাব ইতিমধ্যেই বিশ্ব তেলের বাজারে পড়তে শুরু করেছে।

ভারতের দূতাবাস জানিয়েছে, ১০ মার্চ কাতার এয়ারওয়েজের একাধিক ফ্লাইটে প্রায় ১০০০ ভারতীয় নাগরিককে নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। এই যাত্রীরা দিল্লি, মুম্বই ও কোচি গন্তব্যে পৌঁছেছেন। কাতারে আটকে পড়া ভারতীয়দের দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনতে ভারতীয় দূতাবাস এবং কাতার এয়ারওয়েজ যৌথভাবে সমন্বয় করেছে। আরও একটি ফ্লাইট ১১ মার্চ দিল্লির উদ্দেশে ছাড়ার কথা রয়েছে।

এদিকে সংযুক্ত আরব আমিরশাহির আবুধাবির কাছে অবস্থিত রুওয়াইস তেল শোধনাগারে ড্রোন হামলার পর বড়সড় আগুন লাগে। নিরাপত্তার স্বার্থে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এই রিফাইনারির কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। শিল্পাঞ্চলের একটি অংশে আগুন লাগার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

কাতারও জানিয়েছে, তারা মঙ্গলবার একটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা প্রতিহত করেছে। কাতারের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি সতর্ক করে বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের মধ্যে জ্বালানি অবকাঠামোর উপর হামলা অত্যন্ত বিপজ্জনক নজির তৈরি করছে। এর ফলে শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও বড় প্রভাব পড়তে পারে।

এদিকে সংযুক্ত আরব আমিরশাহি প্রতিদিন প্রায় ৫ থেকে ৮ লক্ষ ব্যারেল তেল উৎপাদন কমিয়েছে বলে নতুন এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। একই সময়ে ইরান ঘোষণা করেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ চলাকালীন পারস্য উপসাগর থেকে এক ফোঁটা তেলও রপ্তানি হতে দেবে না।

সংঘাতের মাঝেই সংযুক্ত আরব আমিরশাহি স্পষ্ট জানিয়েছে, তারা এই যুদ্ধে জড়াতে চায় না। জেনেভায় রাষ্ট্রসংঘে নিযুক্ত ইউএই রাষ্ট্রদূত জামাল আল মুশারাখ বলেছেন, “আমিরশাহিকে অযৌক্তিকভাবে লক্ষ্য করা হচ্ছে। আমরা সংঘাত বাড়াতে চাই না এবং ইরানের বিরুদ্ধে কোনও হামলায় অংশ নিতে চাই না।”

এদিকে অস্ট্রেলিয়া ঘোষণা করেছে, তারা মধ্যপ্রাচ্যে একটি নজরদারি বিমান পাঠাবে এবং ইউএইকে উন্নত এয়ার-টু-এয়ার ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করবে। অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ জানিয়েছেন, ইরানের হামলার বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা জোরদার করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

সংঘাতের প্রভাব পড়েছে বিশ্ব বাণিজ্যেও। হরমুজ প্রণালী, যা বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ, সেখানে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়েছে। ফলে ভারতীয় চাল, অস্ট্রেলিয়ান মাংস ও ইন্দোনেশিয়ার কফি বহনকারী বহু জাহাজ আটকে পড়েছে।

তবুও দুবাইয়ে আপাতত খাদ্য সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে। সুপারমার্কেটগুলিতে এখনও পর্যাপ্ত পণ্য মজুত রয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। সরকার আশ্বস্ত করেছে যে দেশের খাদ্য মজুত কয়েক মাসের জন্য যথেষ্ট।

এরই মধ্যে বাহরাইনের একটি বড় তেল স্থাপনায় ইরানের হামলায় আগুন লাগার খবর সামনে এসেছে। ওই ঘটনার পর রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি সংস্থা ‘বাপকো’ ফোর্স মেজর ঘোষণা করেছে, যা পরিস্থিতির গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন যে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ দ্রুত শেষ হতে পারে। ফ্লোরিডায় সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, “খুব শিগগিরই। খুব দ্রুত।” তবে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড পাল্টা জানিয়েছে, যুদ্ধ কখন শেষ হবে তা যুক্তরাষ্ট্র নয়, ইরানই ঠিক করবে।

মধ্যপ্রাচ্যের এই দ্রুত পরিবর্তনশীল পরিস্থিতি এখন শুধু আঞ্চলিক নয়, বিশ্ব অর্থনীতি, তেল বাজার এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য বড় উদ্বেগ তৈরি করেছে।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন