যে ছবিগুলো দেখতে চেয়েছিল কলকাতা, যে মুহূর্তগুলোর আশায় যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গন ভরে উঠেছিল হাজার হাজার দর্শকে—সেই দৃশ্য মিলল মুম্বইয়ে। শনিবার কলকাতায় মাত্র ২২ মিনিটে মাঠ ছাড়তে হয়েছিল লিওনেল মেসিকে। কিন্তু পরদিন মুম্বইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে ৬১ মিনিট ধরে হাসিমুখে দর্শকদের মন ভরালেন ফুটবলের মহাতারকা।
কলকাতায় সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে মেসির সাক্ষাৎ হয়নি। কিন্তু মুম্বইয়ে সেই অভাব পূরণ হল অন্যভাবে। এক মঞ্চে এলেন লিওনেল মেসি, সচিন তেন্ডুলকর ও সুনীল ছেত্রী—ক্রিকেট ও ফুটবলের দুই যুগের আইকনদের সঙ্গে একই ফ্রেমে দেখা গেল বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলারকে।
ওয়াংখেড়েতে যাওয়ার আগে মেসি গিয়েছিলেন ব্রেবোর্ন স্টেডিয়ামের ‘ক্রিকেট ক্লাব অফ ইন্ডিয়া’-তে। সেখানে ‘প্যাডল কাপ’-এ অংশ নেন তিনি। সঙ্গে ছিলেন লুইস সুয়ারেজ় ও রদ্রিগো ডি’পল। অনুষ্ঠানে হাজির ছিলেন হরভজন সিংহ, করিনা কপূর খান-সহ একাধিক পরিচিত মুখ। কিন্তু কোথাও ভিড় বা বিশৃঙ্খলার ছবি দেখা যায়নি।

দুপুর ২টো থেকেই ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে দর্শকদের প্রবেশ শুরু হয়। মেসি তখনও পৌঁছননি, তবু দর্শকদের বিনোদনের অভাব হয়নি। মাঠে চলছিল প্রদর্শনী ম্যাচ। সুনীল ছেত্রী, আশুতোষ মেহতা, চিংলেনসানা সিংহ, রাহুল ভেকে, বালা দেবীর মতো ফুটবলারদের সঙ্গে খেলেন অভিনেতা ডিনো মোরিয়া, জিম সরবেরাও। গ্যালারিতে দর্শকদের উচ্ছ্বাস ছিল, কিন্তু মাঠে ছিল নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ।
ঘড়ির কাঁটায় বিকেল ৫টা ৫০ মিনিট। সেই সময় মাঠে প্রবেশ করেন মেসি, সুয়ারেজ় ও ডি’পল। তার আগে ঢোকেন মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়ণবীস ও তাঁর স্ত্রী অমৃতা। সচিন তেন্ডুলকরও গ্যালারিতেই বসেন দর্শকদের সঙ্গে। রাজনৈতিক নেতা, তারকা বা অতিথিদের কেউই মাঠে নেমে ভিড় বাড়াননি—এটাই ছিল পার্থক্যের মূল।
মেসিদের চারপাশে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ছিল, কিন্তু কোনও অতিরিক্ত ভিড় বা ফোটোগ্রাফারদের হুড়োহুড়ি দেখা যায়নি। ফলে গ্যালারি থেকে সকলেই পরিষ্কারভাবে মেসিকে দেখতে পেয়েছেন। যে সুযোগ কলকাতায় পাননি দর্শকেরা, ওয়াংখেড়েতে সেটাই বাস্তব হল।

সুনীল ছেত্রীর সঙ্গে হাত মেলালেন মেসি। বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার ও ভারতের সেরা ফুটবলারের সাক্ষাৎ মুহূর্তে করতালিতে ফেটে পড়ে গ্যালারি। সুনীলকে নিজের সই করা আর্জেন্টিনার জার্সি উপহার দেন মেসি। দু’জনেই পেনাল্টি শট নেন, গোল করেন। পরে তিন তারকা গ্যালারিতে একের পর এক বল ছুড়ে দর্শকদের উচ্ছ্বাস বাড়ান। কখনও প্রতিযোগিতার ছলে কে বেশি দূরে বল পাঠাতে পারেন, সেই খেলাও চলেছে।
সবচেয়ে চোখে পড়েছে মেসি, সুয়ারেজ় ও ডি’পলের মুখের হাসি। যুবভারতীতে যেখানে বিরক্তি ও অস্বস্তি স্পষ্ট ছিল, ওয়াংখেড়েতে সেখানে ছিল নিশ্চিন্ত স্বচ্ছন্দ পরিবেশ। একবারের জন্যও ভিড় বা বিশৃঙ্খলা তাঁদের বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি।
এই অনুষ্ঠান ছিল মহারাষ্ট্র সরকারের ‘প্রজেক্ট মহাদেব’-এর উদ্বোধন উপলক্ষ্যে। রাজ্যের ৩৫ জেলা থেকে বাছা ৩০ জন ছেলে ও ৩০ জন মেয়েকে পাঁচ বছরের স্কলারশিপে ফুটবল প্রশিক্ষণ দেওয়ার এই প্রকল্পের সূচনা করেন মেসি। শিশুদের সঙ্গে বল পাসিং খেলতে দেখা যায় তাঁকে, ডি’পলকে দেখে মনে হচ্ছিল যেন সতীর্থদের সঙ্গে অনুশীলনে নেমেছেন।
শেষে মাঠের মাঝখানে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে মেসি, সুয়ারেজ় ও ডি’পলের সঙ্গে মঞ্চে ওঠেন দেবেন্দ্র ফড়ণবীস, সচিন তেন্ডুলকর, প্রফুল্ল পটেল ও অজয় দেবগণ। সচিন নিজের সই করা জার্সি তুলে দেন মেসির হাতে। মেসি পাল্টা উপহার দেন ২০২৬ বিশ্বকাপের বল।
সংবর্ধনায় সচিন বলেন, “মুম্বই স্বপ্নের নগরী। এই মাঠে বহু স্বপ্ন সত্যি হতে দেখেছি। আজ আবার দেখলাম। মেসি শুধু মহান খেলোয়াড় নন, তিনি দারুণ একজন মানুষ।”
৬১ মিনিট ধরে নির্বিঘ্নে চলল একটি আন্তর্জাতিক মানের অনুষ্ঠান। তাল কাটেনি একবারও। ওয়াংখেড়ে দেখিয়ে দিল—সুশৃঙ্খলা, দূরত্ব বজায় রাখা আর সঠিক পরিকল্পনা থাকলে বিশ্বসেরা তারকাকেও কীভাবে সাধারণ দর্শকের কাছে এনে দেওয়া যায়।



