মঙ্গলে অক্সিজেন তৈরি করে ইতিহাস! নাসার ‘MOXIE’ খুলে দিল লাল গ্রহে মানব বসতির নতুন দিগন্ত

নাসার MOXIE যন্ত্র মঙ্গলের কার্বন ডাই-অক্সাইড থেকে সফলভাবে অক্সিজেন তৈরি করেছে। এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে মঙ্গলে মানুষের বসবাস ও প্রত্যাবর্তনের পথ সহজ করতে পারে।

বিজ্ঞাপন
নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

মঙ্গলে অক্সিজেন তৈরি— এতদিন যা ছিল বিজ্ঞান কল্পকাহিনির বিষয়, তা এবার বাস্তবে সম্ভব করে দেখালেন বিজ্ঞানীরা। নাসার পারসিভিয়ারেন্স রোভারে থাকা ‘MOXIE’ নামের একটি যন্ত্র মঙ্গলের বায়ুমণ্ডল থেকেই সফলভাবে শ্বাসযোগ্য অক্সিজেন উৎপাদন করেছে। এই সাফল্য ভবিষ্যতে মঙ্গলে মানুষের দীর্ঘমেয়াদি বসবাস এবং নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের পরিকল্পনাকে নতুন গতি দিতে পারে।

মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা এবং ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি (MIT)-র যৌথ উদ্যোগে তৈরি হয়েছিল MOXIE বা Mars Oxygen In-Situ Resource Utilization Experiment। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে পারসিভিয়ারেন্স রোভারের সঙ্গে মঙ্গলে পৌঁছেছিল এই অত্যাধুনিক যন্ত্র।

বিজ্ঞানীদের মূল লক্ষ্য ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর খোঁজা— মঙ্গলের বায়ুমণ্ডলে থাকা উপাদান ব্যবহার করে কি অক্সিজেন তৈরি করা সম্ভব? কারণ ভবিষ্যতে মানুষকে মঙ্গলে পাঠাতে হলে পৃথিবী থেকে বিপুল পরিমাণ অক্সিজেন বহন করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং জটিল।

প্রায় ১৫ কিলোগ্রাম ওজনের MOXIE দেখতে আকারে একটি ছোট মাইক্রোওভেনের মতো। যন্ত্রটি মঙ্গলের বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড সংগ্রহ করে বিশেষ প্রযুক্তির সাহায্যে সেটিকে ভেঙে অক্সিজেন আলাদা করে।

মঙ্গলের বায়ুমণ্ডলের প্রায় ৯৫ শতাংশই কার্বন ডাই-অক্সাইড। এই গ্যাসের মধ্যেই অক্সিজেনের উপাদান লুকিয়ে থাকে। MOXIE সেই উপাদানকে কাজে লাগিয়ে সলিড অক্সাইড ইলেক্ট্রোলাইসিস পদ্ধতিতে অক্সিজেন উৎপাদন করে।

প্রক্রিয়াটি শুরু হয় বায়ুমণ্ডল থেকে গ্যাস সংগ্রহের মাধ্যমে। এরপর গ্যাসকে সংকুচিত করে প্রায় ৮০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় উত্তপ্ত করা হয়। পরে বিশেষ সেরামিক সেলের মধ্যে বৈদ্যুতিক প্রবাহের সাহায্যে কার্বন ডাই-অক্সাইড অণুকে ভেঙে অক্সিজেন এবং কার্বন মনোক্সাইডে পরিণত করা হয়।

প্রথমদিকে MOXIE প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ৬ গ্রাম অক্সিজেন উৎপাদন করত। তবে পরবর্তী পরীক্ষাগুলিতে সেই ক্ষমতা দ্বিগুণ হয়ে ঘণ্টায় ১২ গ্রাম পর্যন্ত পৌঁছায়। ২০২৩ সালের আগস্ট পর্যন্ত সক্রিয় থাকা এই যন্ত্র মোট ১২২ গ্রাম অক্সিজেন তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিমাণ অক্সিজেন মানুষের দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারের জন্য যথেষ্ট নয়। তবে প্রযুক্তিগতভাবে এটি একটি যুগান্তকারী প্রমাণ, কারণ পৃথিবীর বাইরে অন্য কোনও গ্রহে স্থানীয় সম্পদ ব্যবহার করে এই প্রথম শ্বাসযোগ্য অক্সিজেন তৈরি করা সম্ভব হয়েছে।

বিজ্ঞানীরা হিসাব করে দেখেছেন, চারজন মহাকাশচারীকে মঙ্গল থেকে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনতে প্রায় ২৫ মেট্রিক টন তরল অক্সিজেন প্রয়োজন হবে। বর্তমান MOXIE সেই লক্ষ্য পূরণ করতে পারবে না, কিন্তু ভবিষ্যতে আরও বড় ও শক্তিশালী সংস্করণ তৈরি হলে পরিস্থিতি বদলাতে পারে।

গবেষণায় জানা গিয়েছে, মানুষের ব্যবহারের উপযোগী একটি পূর্ণাঙ্গ সিস্টেমকে প্রতি ঘণ্টায় অন্তত ২ থেকে ৩ কেজি অক্সিজেন উৎপাদন করতে হবে। তার জন্য প্রয়োজন হবে ২৫ থেকে ৩০ কিলোওয়াট নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, যা বর্তমান প্রোটোটাইপের তুলনায় প্রায় ১০০ গুণ বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন।

তবুও MOXIE-এর সাফল্যকে মঙ্গল অভিযানের ইতিহাসে একটি বড় মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে। এখনও মঙ্গলে স্থায়ী মানব বসতির জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, শক্তি ব্যবস্থা এবং জীবনধারণের প্রযুক্তি তৈরি হয়নি। কিন্তু স্থানীয় সম্পদ ব্যবহার করে অক্সিজেন উৎপাদন সম্ভব— এই বাস্তব প্রমাণ ভবিষ্যতের মহাকাশ অভিযানের পথ অনেকটাই সহজ করে দিল। মঙ্গলে মানুষের উপস্থিতির স্বপ্ন এখন আর শুধু তত্ত্ব নয়, ধীরে ধীরে বাস্তবতার দিকেই এগোচ্ছে।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

বিজ্ঞাপন

আরও খবর