কেন্দ্রের আর্থিক বঞ্চনার অভিযোগের মধ্যেই ১০০ দিনের কাজের শর্ত নিয়ে নতুন করে বিস্ফোরণ ঘটালেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সোমবার কোচবিহারে জনসভা থেকে কেন্দ্রের পাঠানো শ্রম আইন-সংক্রান্ত কাগজের প্রতীকী কপি প্রকাশ্যে ছিঁড়ে ফেললেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ, কেন্দ্রের নয়া শ্রম কোডে ১০০ দিনের কাজ বা MGNREGA প্রকল্পে টাকা ছাড়ার জন্য যে নতুন শর্ত চাপানো হয়েছে, তা অসম্মানজনক, অগ্রহণযোগ্য এবং সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
তিনি স্পষ্ট বলেন, “১০০ দিনের কাজে টাকা দেওয়ার জন্য কেন্দ্র যে শর্ত দিয়েছে, তা কখনও মানা হবে না। এটা অসম্মানজনক। তাই আমি এই কাগজ ছিঁড়ে ফেললাম। এটা কেন্দ্রের অফিসিয়াল নোটিস নয়, এটা আমার কাছে থাকা কাগজ। কিন্তু বার্তাটা সবার কাছে পৌঁছে যাক।”


১০০ দিনের কাজের শর্তে কেন্দ্রকে নিশানা, কোচবিহারে কাগজ ছিঁড়ে দিলেন মমতা
এ রাজ্যে আগেই ঘোষণা করা হয়েছিল যে নয়া শ্রম কোড কার্যকর হবে না। রাজ্যের দাবি, কেন্দ্রের চারটি শ্রম কোড বাস্তবায়িত হলে শ্রমিকদের বেতন-বৈষম্য, চাকরি নিরাপত্তা, PF ও ESIC সুবিধা—সব ক্ষেত্রেই জটিলতা আরও বাড়বে। একই সংস্থায় কাজ করেও আলাদা রাজ্যে আলাদা বেতন কাঠামো চালু হবে, যা শ্রমিক স্বার্থবিরোধী।
কোচবিহারের সভায় মমতা বলেন, “তিন-চারদিন আগে কেন্দ্র একটা নোটিস পাঠিয়েছে। বলছে, নতুন শ্রম কোড মানলেই ১০০ দিনের কাজের টাকা ছাড়বে। আমরা এসব শর্ত মানব না। কেন্দ্র এভাবে রাজ্যকে অপমান করতে পারে না।”
মমতার বক্তব্যে আক্রমণের তির ছিল কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে। তিনি জানান, ১০০ দিনের কাজের ৫১,৬১৭ কোটি টাকা এখনও রাজ্যের প্রাপ্য হিসাবে বকেয়া রয়েছে। তাঁর কথায়, “তোমাদের দয়ার দরকার নেই। বিকল্প কাজ আমরা নিজেরাই তৈরি করতে পারি। আবার ক্ষমতায় এলে কর্মশ্রী প্রকল্পের আওতায় নিজেদের ১০০ দিনের কাজই আমরা চালু করব।”


তৃণমূলের দাবি, কেন্দ্রের এই ‘শর্তরাজনীতি’ মূলত রাজনৈতিক প্রতিহিংসা। কারণ, বহুবার চিঠি লেখা সত্ত্বেও MGNREGA প্রকল্পে টাকা ছাড়ানো হচ্ছে না। ফলে কোটি শ্রমিক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। বেড়ে চলেছে আর্থিক চাপ, বেকারত্ব এবং গ্রামাঞ্চলের কর্মসংস্থানের সংকট।
এদিকে কেন্দ্রের পক্ষ থেকে বারবার দাবি করা হয়েছে যে নয়া শ্রম কোড শ্রমিকদের সুবিধার জন্যই আনা হয়েছে। দেশের ৪৪টি বৈচিত্র্যময় শ্রম আইনকে চারটি সমন্বিত কোডে সাজানো হয়েছে—Wage Code, Social Security Code, Industrial Relations Code এবং Occupational Safety Code। কিন্তু বাস্তবায়ন নিয়ে অনেক রাজ্যের আপত্তি রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ আরও পরিষ্কার করে জানিয়ে দিয়েছে—নয়া শ্রম কোড কার্যকর হবে না।
রাজনৈতিক মহলে মনে করা হচ্ছে, কোচবিহারে কাগজ ছিঁড়ে প্রতিবাদ দেখিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কেন্দ্রের সঙ্গে সংঘাতকে আরও এক ধাপ বাড়িয়ে দিলেন। বিশেষ করে ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের আগে গ্রামীণ ভোটব্যাঙ্কের কাছে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
সমীকরণ বলছে, ১০০ দিনের কাজের শর্ত ও বকেয়া টাকা—এই দুটি ইস্যুতেই আগামী দিনে কেন্দ্র–রাজ্য সংঘাত আরও তীব্র হবে। মমতার দাবি, “শ্রমিকের সম্মান নিয়ে কোনও আপস নয়।” অন্যদিকে কেন্দ্র বরাবরই বলেছে, নতুন শ্রম আইন অর্থনীতিকে সহজতর ও কর্মসংস্থানমুখী করবে।
তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই বিরোধ ক্রমশ বৃহত্তর নির্বাচনী বার্তায় রূপ নিচ্ছে। আর মাঠের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে—১০০ দিনের কাজের টাকা ও শ্রম কোড—যা আগামী কয়েক মাসে রাজনীতির অন্যতম কেন্দ্রীয় ইস্যু হয়ে উঠতে চলেছে।








