নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনে বড় রাজনৈতিক মোড়। নিজের শিবিরের প্রার্থী সঞ্চিতা প্রধান দে মনোনয়ন প্রত্যাহার করার পর কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধানকে সমর্থনের ঘোষণা করলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)। শুক্রবার কালীঘাটের বাড়িতে সাংবাদিক বৈঠকে মমতা জানান, বৃহত্তর স্বার্থে এবং INDIA জোটকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যেই নন্দীগ্রামে কংগ্রেসকে সমর্থন করবে তাঁর শিবির।
মমতার এই ঘোষণা আসে নির্বাচন কমিশন তাঁর শিবিরকে নতুন দলীয় নাম ও প্রতীক দেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই। কমিশন ‘মমতা সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম এবং ‘ফুটবল খেলোয়াড়’ প্রতীক বরাদ্দ করার পরেই নন্দীগ্রামে মমতা শিবিরের প্রার্থী সরে দাঁড়ান। সঞ্চিতা প্রধান দে মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নেওয়ায় ওই কেন্দ্রে মমতা শিবিরের আর কোনও প্রার্থী রইল না।
মমতা সাংবাদিক বৈঠকে দাবি করেন, নন্দীগ্রামে কংগ্রেসকে সমর্থনের সিদ্ধান্ত আগে থেকেই নেওয়া ছিল। তাঁর বক্তব্য, কংগ্রেসের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আগে আলোচনা হয়নি এবং রাহুল গান্ধীকেও তিনি আগে থেকে জানাননি। মমতার ভাষায়, বিষয়টি রাহুলের কাছে ছিল ‘সারপ্রাইজ’। রাহুলের সঙ্গে ফোনে কথা হওয়ার কথাও তিনি জানান।
তবে রাহুল গান্ধীর ফোনের পরেই রাজনৈতিক সমীকরণ বদলেছে কি না, তা নিয়ে জল্পনা তৈরি হয়েছে। কারণ, তৃণমূলের পক্ষ থেকে এর আগে কংগ্রেসের সঙ্গে উপনির্বাচনী সমঝোতার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল বলে রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছিল। সেই প্রস্তাবে নন্দীগ্রামে তৃণমূল সরে দাঁড়ানোর বিনিময়ে রেজিনগরে কংগ্রেসের সমর্থন চাওয়া হয়েছিল বলে জানা যায়। কংগ্রেস সেই প্রস্তাবে সাড়া দেয়নি।
সাংবাদিক বৈঠকে মমতা নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত নিয়েও তীব্র আপত্তি জানান। তিনি কমিশনের সিদ্ধান্তকে ‘অসাংবিধানিক’ এবং ‘অগণতান্ত্রিক’ বলে অভিহিত করেন। পাশাপাশি জানান, তিনি তাঁর তৈরি করা তৃণমূলের নাম ও প্রতীকের দাবি থেকে সরে যাচ্ছেন না। এই বক্তব্য তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান হিসেবে উল্লেখযোগ্য; নির্বাচন কমিশনের ১৭ সেপ্টেম্বরের অন্তর্বর্তী নির্দেশে অবশ্য দুই শিবিরকেই আসন্ন উপনির্বাচনের জন্য আলাদা নাম ও প্রতীক ব্যবহারের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
এদিকে নন্দীগ্রামে সঞ্চিতা প্রধান দে-র মনোনয়ন প্রত্যাহারও নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। শুক্রবার তিনি নবান্নে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন বলে একাধিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। এরপরই তিনি মনোনয়ন প্রত্যাহার করেন। তবে তাঁর সিদ্ধান্তের কারণ সম্পর্কে তিনি প্রকাশ্যে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেননি। একটি ছবি নিয়েও বিভিন্ন রিপোর্টে আলোচনা হয়েছে, যদিও ছবিটির সত্যতা নিয়ে একটি প্রতিবেদনে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
এরপরই কংগ্রেসকে সমর্থনের সিদ্ধান্ত সামনে আসে। অর্থাৎ ৬ অক্টোবরের নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনে মমতা শিবিরের নিজস্ব কোনও প্রার্থী থাকছেন না। কংগ্রেসের মিলন প্রধানের পক্ষে সমর্থন দেওয়ার কথা জানিয়েছেন মমতা। রেজিনগর কেন্দ্র নিয়ে অবশ্য এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেননি তিনি।
মমতার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন কংগ্রেসের প্রবীণ নেতা অধীর রঞ্জন চৌধুরী (Adhir Ranjan Chowdhury)। তিনি মমতার রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে বলেন, নন্দীগ্রামে মমতা যে প্রার্থী দাঁড় করিয়েছিলেন, তিনি ময়দান ছেড়ে সরে গিয়েছেন। এরপর কংগ্রেসকে সমর্থনের সিদ্ধান্ত নেওয়া মমতার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
অধীর আরও কটাক্ষ করেন, নির্বাচন কমিশন এক শিবিরকে ‘ফুটবল খেলোয়াড়’ এবং অন্য শিবিরকে ‘খাম’ প্রতীক দিয়েছে। তাঁর বক্তব্যে এই প্রতীক বরাদ্দকে ঘিরে রাজনৈতিক বিদ্রূপও ছিল। একই সঙ্গে তিনি প্রশ্ন তোলেন, মমতা শিবিরের নিজস্ব প্রার্থী না থাকলে তাঁরা কার হয়ে নির্বাচনী লড়াই করবেন।
কংগ্রেসকে মমতার এই প্রকাশ্য সমর্থন অবশ্য দুই দলের মধ্যে নতুন আনুষ্ঠানিক জোট তৈরি হয়েছে—এমন ঘোষণা নয়। মমতা নিজে এটিকে বৃহত্তর স্বার্থে এবং INDIA জোটকে শক্তিশালী করার সিদ্ধান্ত হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। নন্দীগ্রামের ভোটে এই সমর্থনের রাজনৈতিক প্রভাব কী হবে, তা এখনই নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। আপাতত নিশ্চিত, মমতা শিবিরের প্রার্থী সরে দাঁড়িয়েছেন এবং কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধানকে সমর্থনের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছেন মমতা।



