সুপ্রিম কোর্টের এজলাসে কয়েক মিনিটের উপস্থিতিই বদলে দিল রাজনৈতিক আবহ। এসআইআর মামলায় স্বয়ং সওয়াল করে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে বার্তা দিলেন, তা শুধু আইনি লড়াইয়ের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকল না—সরাসরি ছুঁয়ে গেল ভোটমুখী রাজনীতির স্নায়ু। ফলত, দিল্লির শুনানি পর্ব শেষ হতেই তৃণমূল শিবিরে যেন নতুন করে প্রাণসঞ্চার। সংগঠনের অন্দরে স্পষ্ট ধারণা—এসআইআরের ময়দানে দিদিই একাই খেলা ঘুরিয়ে দিলেন।
‘খেলা হবে’ স্লোগানকে কিছু দিন আগেই আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। বলেছিলেন, ‘‘এ বার শুধু খেলা হবে না, ফাটাফাটি খেলা হবে।’’ বুধবার প্রধান বিচারপতির এজলাসে দাঁড়িয়ে যে ভাবে নির্বাচন কমিশনের যুক্তির পাল্টা যুক্তি তুলে ধরলেন তিনি, তাতে তৃণমূলের বিশ্বাস আরও দৃঢ় হয়েছে—আইনি প্রশ্নের বাইরে গিয়ে এই লড়াই ভোটের রাজনীতিতে তাদের পক্ষে হাওয়া তুলবে। সেই বিশ্বাস থেকেই দলের অন্দরে কার্যত বিজয়োৎসবের সুর। সাংসদ, মন্ত্রী, বিধায়কদের কথাবার্তায় আত্মবিশ্বাস স্পষ্ট।

দলের প্রথম সারির নেতারা বলছেন, এসআইআর পর্বের শুরুতে বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারীর কড়া হুঁশিয়ারিতে নিচুতলার কর্মীদের মধ্যে খানিকটা জড়তা তৈরি হয়েছিল। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাংগঠনিক উদ্যোগে সেই জড়তা অনেকটাই কাটে। কিন্তু বুধবার দুপুরের পর থেকে যে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে, তা অভূতপূর্ব—কার্যত কর্পূরের মতো উবে গিয়েছে ভয় আর দ্বিধা।
তৃণমূল নেতৃত্ব মমতার এই পদক্ষেপকে পাঁচটি আলাদা দিক থেকে ব্যাখ্যা করছে। প্রথমত, বিজেপির বিরুদ্ধে রাজ্যে একমাত্র মুখ হিসেবে মমতার অবস্থান আরও পোক্ত হয়েছে। দ্বিতীয়ত, বিজেপি-বিরোধী বাড়তি ভোট তাঁর দিকেই ঝুঁকবে—যার ধাক্কা গিয়ে পড়তে পারে কংগ্রেস ও বাম শিবিরে। ইতিমধ্যেই সেই ইঙ্গিত মিলেছে। সকালে সিপিএমের তরফে যেখানে এই পদক্ষেপকে ‘নাটক’ বলা হচ্ছিল, শুনানি শেষে সিপিআইএমএল (লিবারেশন)-এর নেতৃত্ব একে ‘ইতিবাচক’ বলে আখ্যা দেন। তাতে স্পষ্ট, বিজেপি-বিরোধী রাজনীতির ভেতরে নতুন দোদুল্যমানতা তৈরি হয়েছে।
তৃতীয়ত, সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্ক নিয়ে তৃণমূলের যে অস্বস্তি তৈরি হয়েছিল—ওয়াকফ সংক্রান্ত বিতর্ক বা হুমায়ুন কবীরের দল গড়া ঘিরে—মমতার সওয়াল সেই ক্ষতে প্রলেপ দেবে বলেই শাসকদলের বিশ্বাস। বিজেপি যখন হিন্দু ভোটের মেরুকরণকে তুঙ্গে তুলতে চাইছে, তখন সংখ্যালঘু ভোটে আস্থার পুনর্নির্মাণ তৃণমূলের কাছে কৌশলগত ভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।


চতুর্থত, জাতীয় রাজনীতিতে বিজেপি-বিরোধী পরিসরে তৃণমূলের উচ্চতা এই ঘটনায় কয়েক গুণ বেড়েছে বলেই দলের ধারণা। কেরল বা তামিলনাড়ুর মতো অ-বিজেপি শাসিত রাজ্যে এসআইআর নিয়ে প্রতিবাদ হলেও, সেখানে কোনও মুখ্যমন্ত্রী মমতার মতো করে সুপ্রিম কোর্টে গিয়ে সওয়াল করেননি। তৃণমূল দেখাতে চাইল—তারা শুধু রাস্তায় নয়, সর্বোচ্চ আদালতেও লড়াই করতে প্রস্তুত।
পঞ্চমত, দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও নিষ্ক্রিয়তার যে অভিযোগ ছিল, এই মুহূর্ত সেই সব গ্লানি মুছে দিচ্ছে। নেতাদের বক্তব্য, মমতার সওয়াল বহু নিষ্ক্রিয় কর্মীকেও ফের রাস্তায় নামতে বাধ্য করবে।

এই মনোভাবের প্রতিফলন মিলেছে শীর্ষ নেতাদের মন্তব্যে। আরজি কর পর্বে ‘বিদ্রোহী’ হয়ে ওঠা সুখেন্দুশেখর রায় পর্যন্ত আবেগপ্রবণ হয়ে বলেছেন, ‘‘এমন নেত্রী কখনও দেখিনি।’’ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাবি, ‘‘সুপ্রিম কোর্টের ইতিহাসে নজির গড়লেন মমতাদি।’’ এমনকি তীব্র মমতা-বিরোধী বলে পরিচিত অধীর চৌধুরী ঘনিষ্ঠ এক কংগ্রেস নেতার মুখেও শোনা গেছে—‘‘এই মহিলা ক্ষণজন্মা রাজনীতিক।’’
সোমবার ফের এসআইআর মামলার শুনানি। মমতা দিল্লিতে যাবেন কি না, তা নিয়ে তৃণমূলের অন্দরেও মতভেদ আছে। কেউ বলছেন, তিনি আবার হাজির হবেন। কেউ বলছেন, তিন দিনের সফরেই যা রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার ছিল, তা দেওয়া হয়ে গিয়েছে। তবে উভয় পক্ষই এক বিষয়ে একমত—মমতা দিল্লিতে থাকুন বা না থাকুন, এই মুহূর্তে দিল্লিই যেন তাঁর রাজনীতির ময়দান হয়ে উঠেছে।







