মালদহের জনসভা থেকে সংশোধিত ওয়াকফ আইন নিয়ে ফের সুর চড়ালেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কেন্দ্রীয় সরকারের আনা নতুন ওয়াকফ আইন নিয়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তা দূর করতে তিনি স্পষ্ট জানালেন—তিনি থাকতে কোনও ধর্মস্থানের ওপর বা মানুষের সম্পত্তির ওপর “হাত দিতে দেবেন না।”
সভা থেকে মমতা দাবি করেন, দেশের নতুন ওয়াকফ আইন তৈরি করেছে বিজেপি নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকার। রাজ্য নয়। তাঁর ভাষায়, “ওয়াকফ আইনের সংশোধন আমরা করিনি। করেছে বিজেপি সরকার।” এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চান, ওয়াকফ সম্পত্তি নিয়ে কোনও বিভ্রান্তি হলে তার দায় রাজ্যের নয়, বরং কেন্দ্রীয় আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ার।
ওয়াকফ আইন নিয়ে মমতার কড়া আশ্বাস, ‘কোনও ধর্মস্থানে হাত দিতে দেব না’
নতুন আইনে স্পষ্ট করা হয়েছে, কোনও সম্পত্তিকে ওয়াকফ হিসেবে ঘোষণা করার অধিকার আর একমাত্র ওয়াকফ বোর্ডের হাতে নেই। সেই ক্ষমতা পেয়েছেন জেলাশাসক বা সমমর্যাদার আধিকারিক। আর এতেই দেশজুড়ে ক্ষোভ ছড়িয়েছে। মুর্শিদাবাদ, মালদহ, উত্তর দিনাজপুরসহ বাংলার বিভিন্ন জেলার মানুষ রাস্তায় নেমেছেন।
মমতা জানান, রাজ্য বিধানসভায় এই আইনের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই প্রস্তাব পাশ হয়েছে। পাশাপাশি রাজ্য সরকার সুপ্রিম কোর্টে মামলা করেছে, এবং সেই মামলা এখনও চলছে। তিনি সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্ককে আশ্বস্ত করতে বলেন, “আমরা আছি। এইসব জায়গায় হাত দিতে দেব না। কোনও ধর্মস্থানে হাত দিতে দেব না। আমি ধর্মের নামে রাজনীতি করি না।”
ওয়াকফ আইন ইস্যুতে রাজ্যের অবস্থান দৃঢ়
মমতার বক্তব্য অনুসারে, ওয়াকফ আইন সংশোধন জনমানসকে সরাসরি প্রভাবিত করছে। তিনি মনে করেন, এটি মানুষের সম্পত্তির ওপর হস্তক্ষেপের দরজা খুলে দেয়। তাই তিনি নিয়মিত বিভিন্ন সভায় এ বিষয়ে অবস্থান স্পষ্ট করছেন। তাঁর কথায়, মানুষকে ভয় বা বিভ্রান্তির মধ্যে রাখার কোনও প্রয়োজন নেই, কারণ রাজ্য সরকার মানুষের পাশে রয়েছে।

মালদহে এসআইআর ইস্যুতেও তোপ দাগলেন মুখ্যমন্ত্রী
ওয়াকফ আইনের পাশাপাশি এসআইআর-নিয়ে তৈরি হওয়া আতঙ্ককেও এদিন জনসভা থেকে নস্যাৎ করেন মমতা। এমতাবস্থায় তিনি পরিষ্কার জানান, তিনি ভোট চাইতে নয়—মানুষের দুশ্চিন্তা দূর করতে এসেছেন। তাঁর বার্তা, “নিশ্চিন্তে থাকুন। কেউ ভয় পাবেন না।”
এদিন আরও আক্রমণাত্মক হয়ে বিজেপিকে নিশানা করে তিনি দাবি করেন, “বিজেপি এসআইআর করে নিজের কবর নিজেরাই খুঁড়েছে।” এ বক্তব্যে তিনি বোঝাতে চান, এই প্রক্রিয়া মানুষকে অসন্তুষ্ট করছে এবং এর রাজনৈতিক মূল্য দিতে হবে বিজেপিকে।
রাজনৈতিক তরঙ্গে ওয়াকফ ও এসআইআর এখন কেন্দ্রবিন্দু
বাংলার রাজনৈতিক আবহে এই মুহূর্তে ওয়াকফ আইন এবং এসআইআর—দুইই সবচেয়ে আলোচিত বিষয়। সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্কে প্রভাব ফেলতে পারে এই দুটি ইস্যু। তাই তৃণমূল সুপ্রিমো জনসভায় বারবার আশ্বাস দিচ্ছেন, রাজ্য সরকার কোনওভাবেই মানুষের অধিকার বা ধর্মস্থানের ওপর আঘাত মেনে নেবে না।
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের আশঙ্কা বেড়েছে কেন্দ্রীয় পোর্টালে ওয়াকফ সম্পত্তি নথিভুক্তিকরণের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর। মমতা সেই ভয়কেও কমানোর চেষ্টা করেন। তাঁর বক্তব্য, “মানুষকে বিশ্বাস রাখতে বলছি। আমরা আছি, ভয় পাবেন না।”
নির্বাচন-পূর্ব আবহে রাজনৈতিক বার্তা
বিশেষজ্ঞদের মতে, লোকসভা নির্বাচনের আগে এ ধরনের স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা সংখ্যালঘু ভোটারদের মধ্যে নিরাপত্তা ও আস্থার পরিবেশ তৈরির চেষ্টা। কেন্দ্র বনাম রাজ্য দ্বন্দ্বও তাই আরও তীব্র হচ্ছে। ওয়াকফ আইন, এনআরসি, সিএএ, এসআইআর—প্রতিটি বিষয়েই তৃণমূল বিজেপিকে আক্রমণ করার সুযোগ পাচ্ছে।
মালদহের সভা থেকে মমতা আবারও সেই রাজনৈতিক অবস্থানকে শক্ত করে দিলেন—মানুষের সম্পত্তি ও ধর্মস্থানের সুরক্ষায় তিনি আপস করবেন না।







