বঙ্গ রাজনীতির তীব্র কটাক্ষ, কাদা ছোড়াছুড়ি আর তীব্র মেরুকরণের মাঝেও বৃহস্পতিবার লোকভবনে দেখা গেল এক অন্য ছবি। নতুন রাজ্যপাল আরএন রবির শপথ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান বিমান বসু। আর সেখানেই ঘটে এমন এক মুহূর্ত, যা অনেকের মতে সাম্প্রতিক রাজনীতির পরিবেশে প্রায় বিরল—বিমান বসুকে দেখে নিজে এগিয়ে গিয়ে তাঁকে সামনে বসতে অনুরোধ করেন মুখ্যমন্ত্রী। সেই সৌজন্যে আপ্লুত হয়ে অশীতিপর বর্ষীয়ান বাম নেতা কাঁপা গলায় শুধু বলতে পেরেছেন, “ধন্যবাদ”।
বৃহস্পতিবার রাজ্যের নতুন রাজ্যপাল হিসেবে শপথ নেন আরএন রবি। লোকভবনে আয়োজিত সেই অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী, বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা। অনুষ্ঠানে নির্দিষ্ট আসন বিন্যাসও ছিল। শপথমঞ্চের প্রথম সারিতে মুখ্যমন্ত্রী, বিধানসভার স্পিকার এবং কলকাতার মেয়রের জন্য আসন বরাদ্দ ছিল। দ্বিতীয় সারিতে ছিল মুখ্যমন্ত্রীর নিরাপত্তারক্ষীদের আসন এবং তৃতীয় সারিতে অন্যান্য রাজনৈতিক নেতাদের বসার ব্যবস্থা।


সেই নিয়মেই তৃতীয় সারিতে বসেছিলেন বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান বিমান বসু। অনুষ্ঠানে এসে তাঁকে পিছনের সারিতে বসে থাকতে দেখে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অবাক হয়ে বলেন, “আরে বিমানদা, আপনি এসেছেন! পিছনে কেন বসে আছেন? সামনে আসুন।” এরপর প্রায় জোর করেই তাঁকে তৃতীয় সারি থেকে তুলে এনে প্রথমে নিজের নিরাপত্তারক্ষীদের আসনে বসান।
কিছুক্ষণ পর আবার মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “মেয়র তো আসবেন না, আসনটা ফাঁকাই আছে। বিমানদা, আপনি আমার পাশে বসুন।” প্রথমে আপত্তি জানান বিমান বসু। তিনি বলেন, “না না, আমি এখানেই ঠিক আছি।” কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী সেই আপত্তি শোনেননি। শেষ পর্যন্ত তাঁকে প্রথম সারির আসনে বসান তিনি।
শুধু আসনে বসানোতেই শেষ হয়নি সৌজন্য। শপথ অনুষ্ঠান শেষে সবাই যখন বেরিয়ে যাচ্ছেন, তখন মুখ্যমন্ত্রীর নজরে পড়ে লোকভবনের দক্ষিণ পোর্টিকোর কাছে বিমান বসু গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছেন। রোদের মধ্যে তাঁকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আবার এগিয়ে গিয়ে বলেন, “আপনি এখানে দাঁড়িয়ে কেন? আপনার গাড়ি কোথায়?”


এরপর নিজের গাড়ি এসে গেলেও তাতে ওঠেননি মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, “আগে বিমানদার গাড়ি আসুক, ওঁকে গাড়িতে তুলে দিয়ে তারপর আমি যাব।” কিছুক্ষণ পর বিমান বসুর গাড়ি এলে তাঁকে গাড়িতে উঠতে সাহায্য করেন তিনি।
মুখ্যমন্ত্রীর এই আচরণে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন ৮৩ বছরের বর্ষীয়ান বাম নেতা বিমান বসু। কাঁপা গলায় তিনি শুধু বলেন, “ধন্যবাদ।” রাজনৈতিক মতপার্থক্যের ঊর্ধ্বে উঠে প্রবীণ নেতার প্রতি এই সম্মান প্রদর্শন অনেকের কাছেই বাংলার রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক উজ্জ্বল মুহূর্ত হয়ে রইল।







