জাতীয় ভোটার দিবসের দিনই নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে সরাসরি কড়া ভাষায় আক্রমণ শানালেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সোশাল মিডিয়ায় পোস্ট করে তিনি দাবি করেন, নির্বাচন কমিশন এখন “হিজ মাস্টার্স ভয়েস” হয়ে মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার কাজে ব্যস্ত, অথচ সেই কমিশনই ভোটার দিবস পালন করছে—যা তাঁর মতে “করুণ প্রহসন”। মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ, SIR (Special Intensive Revision) প্রক্রিয়াকে সামনে রেখে কমিশন একের পর এক “অজুহাত” তৈরি করে সাধারণ মানুষের উপর চাপ বাড়াচ্ছে, ফলে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিযোগ, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ ও বিধি মেনে ভোটারদের অধিকার রক্ষা করার বদলে নির্বাচন কমিশন “লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সি”-র নামে নতুন নতুন কারণ দেখিয়ে মানুষকে হয়রানি করছে। তাঁর দাবি, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভোটারদের উপর “অভূতপূর্ব অত্যাচার” চালানো হচ্ছে এবং তাঁদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। একইসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচন কমিশনের উপর বিজেপির হয়ে কাজ করার অভিযোগও তোলেন। তাঁর কথায়, “তাদের প্রভু বিজেপি-র হয়ে তারা বিরোধীদের ধ্বংস করতে চায়”—এবং এর মাধ্যমেই দেশের গণতন্ত্রের ভিত্তিমূলে আঘাত করা হচ্ছে।

মুখ্যমন্ত্রীর পোস্টে আরও বিস্ফোরক দাবি উঠে আসে। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনের চাপ ও হয়রানির ফলেই এখনও পর্যন্ত “১৩০ জনের বেশি মানুষ মারা গিয়েছেন”। অভিযোগের তীব্রতা বাড়িয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন, কীভাবে ৮৫, ৯০, ৯৫ বছরের প্রবীণ মানুষকে এবং শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধীদেরও কমিশনের সামনে হাজির হতে বাধ্য করা যায়। তাঁর দাবি, এই বেআইনি চাপের ফলেই আত্মহত্যা ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে এবং কমিশন রাজনৈতিক নির্দেশেই এমন পদক্ষেপ করছে।
মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ, এই পুরো প্রক্রিয়া নাগরিকদের জন্য কার্যত NRC-র মতো পরিস্থিতি তৈরি করছে এবং বিশেষ করে সংখ্যালঘু ও তপশিলি জাতি-উপজাতির মানুষের মধ্যে ভয় ও অনিশ্চয়তা বাড়ছে। তাঁর বক্তব্য, নির্বাচন গণতন্ত্রের উৎসব হলেও কমিশনের “পক্ষপাত-দুষ্ট আচরণ” এবং একতরফা পদক্ষেপ সেই উৎসবকে আতঙ্কে বদলে দিচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশনের “ভোটার দিবস উদযাপনের অধিকার নেই”—এমন মন্তব্যও করেন তিনি।
অন্যদিকে, মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্যের সমালোচনা করলেও জাতীয় ভোটার দিবসের দিন নির্বাচন কমিশনকে নিশানা করেছেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যও। তিনি বলেন, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে পশ্চিমবঙ্গে এসে পরিস্থিতি দেখা উচিত—বীরভূম, মুর্শিদাবাদ, ডোমকল, ভাঙড়ের মতো জায়গায় গিয়ে মাটির পরিস্থিতি বোঝা প্রয়োজন। শমীকের অভিযোগ, পশ্চিমবঙ্গে SIR-এর নামে “প্রহসন” চলছে এবং BLO-রা আক্রান্ত হচ্ছেন। তাঁর দাবি, ভুয়ো তথ্য আপলোড করিয়ে সমাজের প্রতিষ্ঠিত মানুষদের, এমনকি বৃদ্ধদেরও হিয়ারিংয়ে ডেকে আনা হচ্ছে—এবং এই কাজ করাচ্ছে তৃণমূল।


এদিন আলিপুরের ধনধান্য অডিটোরিয়ামে জাতীয় ভোটার দিবসের অনুষ্ঠান করে মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক (CEO)-এর দফতর। সেখানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। সেই অনুষ্ঠানেই BLO মৃত্যুর প্রসঙ্গ তুলে প্রশ্ন তোলেন তৃণমূল রাজ্য সভাপতি সুব্রত বক্সী। জবাবে মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজ কুমার আগরওয়াল বলেন, তাঁরা রিপোর্ট চেয়েছেন, কিন্তু রিপোর্ট না পেলে কীভাবে বলা সম্ভব যে SIR-এর জন্যই মৃত্যু হয়েছে। তিনি জানান, BLO-দের DEO অফিসে বিষয়টি জানাতে বলা হবে এবং জেলা প্রশাসনকে রিপোর্ট পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হবে।
অনুষ্ঠানে রোহিঙ্গা ও অনুপ্রবেশকারী সংক্রান্ত বিষয়ও উঠে আসে। প্রদেশ কংগ্রেস সাধারণ সম্পাদক আশুতোষ চট্টোপাধ্যায় অনুপ্রবেশকারীদের তথ্য দেওয়ার দাবি তুললেও CEO মনোজ কুমার আগরওয়াল জানান, সেটি তাঁদের দায়িত্ব নয়—তাঁরা মূলত ASDD সংক্রান্ত বিষয় দেখেন।

এদিকে, SIR-হয়রানি অভিযোগে রাজনৈতিক আন্দোলনও জোরদার হচ্ছে। শনিবার ভার্চুয়াল বৈঠকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দেশের পর গড়িয়াহাটে মিছিল করে মহিলা তৃণমূল। একই ইস্যুতে মহেশতলা থেকে বজবজ পর্যন্ত বাইক মিছিল করে সিপিএম। বিজেপি নেতা সজল ঘোষ এই দুই দলের আন্দোলনকে কটাক্ষ করে বলেন, তৃণমূল ও সিপিএম “টাকার এপিঠ আর ওপিঠ”—দু’দল একই উদ্দেশ্যে, একই ভাষায় কথা বলছে, একইদিনে মিছিল করছে। তাঁর ব্যঙ্গ, একসঙ্গে করলেই আরও ভালো হত।







