উপনির্বাচনের আগে তৃণমূলের অন্দরের টানাপোড়েন আরও প্রকাশ্যে। উত্তর দিনাজপুরের ইসলামপুরে দলীয় কর্মিসভায় ফোনে দেওয়া বার্তায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দল ছেড়ে যাওয়া সাংসদ ও বিধায়কদের ১৫ দিনের মধ্যে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। সময়সীমার মধ্যে না ফিরলে পরে দলে জায়গা থাকবে না বলেও বার্তা দিয়েছেন তিনি।
মমতার সেই বার্তার পরেই পাল্টা মুখ খুলেছেন দীর্ঘদিনের তাঁর রাজনৈতিক সঙ্গী মদন মিত্র। বর্তমানে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়-ঘনিষ্ঠ শিবিরে থাকা কামারহাটির বিধায়ক স্পষ্ট করে দিয়েছেন, ১৫ দিন তো দূরের কথা, সময়সীমা ১৫ মাস হলেও তিনি পুরনো দলে ফিরতে রাজি নন।
ইসলামপুরের সভায় মমতার বক্তব্য পৌঁছে দিয়েছিলেন কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। মমতার বার্তার মূল বক্তব্য ছিল, যাঁরা দল ছেড়ে চলে গিয়েছেন, তাঁরা ফিরে আসতে চাইলে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই ফিরুন। একই সঙ্গে তিনি কর্মী-সমর্থকদের গুরুত্বের কথাও তুলে ধরেন।
‘কর্মীরাই দলের সম্পদ’, পাল্টা মদন
মমতার এই বার্তার জবাবে মদন মিত্র বলেন, দলের কর্মীরাই সংগঠনের আসল সম্পদ। তাঁর বক্তব্য, কর্মীদের সঙ্গে কথা না বলে বা তাঁদের আস্থা না বুঝে দলত্যাগীদের ফেরানোর আহ্বান জানালে সেই উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
মদনের কথায়, তৃণমূলের কর্মীদের মধ্যে যাঁরা দীর্ঘদিন সংগঠনের সঙ্গে ছিলেন, তাঁদের অভিজ্ঞতা ও অবস্থানকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। তিনি মমতার উদ্দেশে বলেন, আগে কর্মীদের বিশ্বাস ফেরাতে হবে, তার পর দল ছেড়ে যাওয়া নেতাদের ফেরার প্রসঙ্গ আসবে।
এরপরই আরও কড়া সুরে মদন জানান, তিনি আর মমতার শিবিরে ফিরবেন না। তাঁর বক্তব্য, ১৫ দিনের বদলে ১৫ মাস সময় দেওয়া হলেও তিনি প্রয়োজনে রাজনীতি ছেড়ে দেবেন, কিন্তু পুরনো দলে ফিরবেন না।
মদন আরও বলেন, তিনি নিজের ‘ফেরার দরজা’ নিজেই বন্ধ করে দিয়েছেন। তাঁর এই মন্তব্যকে বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান থেকে সরে না আসার স্পষ্ট বার্তা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর তৃণমূলের ভাঙন এবং দলীয় প্রতীক ও নাম নিয়ে দুই শিবিরের বিরোধের মধ্যেই মমতার এই বার্তা সামনে এল। মমতাপন্থী শিবিরের পক্ষ থেকে দলত্যাগী সাংসদ ও বিধায়কদের ফেরার আহ্বান জানানো হলেও, বিদ্রোহী শিবির নিজেদের অবস্থান থেকে সরে আসার কোনও ইঙ্গিত দেয়নি।
ইসলামপুরের সভাটি ছিল নির্বাচনের পর উত্তরবঙ্গে মমতাপন্থী তৃণমূলের অন্যতম বড় সাংগঠনিক কর্মসূচি। সেখানে ফোনে বক্তব্য রাখেন মমতা। তিনি দাবি করেন, কর্মীরাই দলের প্রকৃত শক্তি এবং সংগঠনকে আবারও শক্তিশালী করার ব্যাপারে তিনি আশাবাদী।
এই আবহেই মদন মিত্রের মন্তব্যে স্পষ্ট হল, অন্তত তাঁর ক্ষেত্রে মমতার ‘ফিরে আসার’ আহ্বান গ্রহণ করার কোনও প্রশ্ন নেই।
বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও মন্তব্য করেন মদন। তাঁর বক্তব্য, রাজ্যে ক্ষমতার পালাবদলের পর একাধিক ঘটনা ঘটলেও এখনই রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই। বরং পুরসভা নির্বাচনকে সামনে রেখেই পরবর্তী বড় রাজনৈতিক লড়াই তৈরি হবে বলে মনে করেন তিনি।
তবে এই বক্তব্য মদনের রাজনৈতিক অবস্থান। এর সঙ্গে মমতা বা অন্য কোনও রাজনৈতিক দলের অভিমতকে এক করে দেখা যাবে না।
এদিকে অভিনেত্রী কোয়েল মল্লিকের বিজেপিতে যোগদান এবং রাজ্যসভা প্রার্থী হওয়া নিয়েও মুখ খুলেছেন মদন মিত্র। তাঁর কথায়, কোয়েল ভবানীপুরের পুরনো পরিবারের মেয়ে এবং চলচ্চিত্র জগতে তাঁর যথেষ্ট পরিচিতি রয়েছে।
কোয়েলের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবেই দেখছেন মদন। তাঁর বক্তব্য, তৃণমূল যখন অবিভক্ত ছিল, তখন কোয়েল রাজ্যসভায় গিয়েছিলেন; এবার বিজেপি তাঁকে রাজ্যসভা প্রার্থী করেছে। মদনের কথায়, রাজনীতিতে ব্যক্তিগত আঘাত থাকলেও ‘দুঃখ’ বলে কিছু নেই।
কোয়েল মল্লিককে বিজেপি রাজ্যসভা উপনির্বাচনের প্রার্থী করার পরই তাঁর রাজনৈতিক যাত্রা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। এর আগে তৃণমূলের প্রার্থী হিসেবেও তিনি রাজ্যসভায় গিয়েছিলেন। বিজেপিতে যোগ দেওয়ার পর এবার সেই একই সংসদীয় কক্ষের জন্য ফের প্রার্থী হয়েছেন তিনি।
সব মিলিয়ে, ইসলামপুরের সভা থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ১৫ দিনের বার্তা এবং তার পরেই মদন মিত্রের কড়া জবাব—উপনির্বাচনের আগে তৃণমূলের ভাঙন ও পাল্টা সংগঠন তৈরির রাজনীতিকে ফের আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এল।



