দীর্ঘ ১১ মাসের বেতন বকেয়া এবং অনুদানের অভাবে চরম আর্থিক সঙ্কটে পড়েছেন রাজ্যের বহু মাদ্রাসা শিক্ষক-শিক্ষিকা। অভিযোগ—বেতন নেই, মিড-ডে মিলের বরাদ্দ নেই, অথচ প্রতিদিন নিয়ম করে ক্লাস নিতে বাধ্য হচ্ছেন তাঁরা। এই ক্ষোভেই মঙ্গলবার রাস্তায় নামলেন West Bengal Recognized (Un-Aided) Madrasah Teacher’s Association-এর সদস্যরা। তাঁদের সোজাসাপ্টা প্রশ্ন—“কাজ করব, অথচ বেতন পাব না—এটা কি করে সম্ভব?”
শিক্ষকদের অভিযোগ, সংখ্যালঘু শিক্ষাপ্রণালীর উন্নয়ন নিয়ে সরকার বছরের পর বছর উদাসীন। মুখ্যমন্ত্রী ক্ষমতায় এসে ১০ হাজার মাদ্রাসা তৈরির আশ্বাস দিয়েছিলেন—কিন্তু তার অর্ধেক প্রয়োজনীয়তা বা কাঠামো আজও বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে শিক্ষকরা আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত, শিক্ষার মানেও পড়ছে প্রভাব।


এদিন শিয়ালদহ থেকে কালীঘাট পর্যন্ত মিছিলের ডাক থাকলেও, নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে পুলিশ ধর্মতলাতেই মিছিল থামিয়ে দেয়। সেখান থেকেই শিক্ষক-শিক্ষিকারা নবান্নমুখী হন এবং মুখ্যমন্ত্রীর বিশেষ আধিকারিকের হাতে স্মারকলিপি তুলে দেন।
শিক্ষকদের আওয়াজ: “১০ ডিসেম্বরের আগে বেতন দিন, নয়তো বৃহত্তর আন্দোলন”
অ্যান্ডয়লনরত শিক্ষকদের দাবি, ১১ মাস ধরে তারা কোনও বেতন পাননি। অত্র মাদ্রাসাগুলির জন্য কোনও সরকারি অনুদান নেই, ফলে নিজস্ব অর্থে স্কুল চালানো প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠছে। তার উপর মিড-ডে মিল বন্ধ থাকায় ছাত্রছাত্রীদের উপস্থিতিও কমছে।
শিক্ষকদের বক্তব্য, “বেতনের টাকাই যখন হাতে আসে না, তখন কী করে পরিবার চালাব? কীভাবে স্কুল সামলাব? এটা মানবিকতারও প্রশ্ন।”


তাঁরা তিনটি দাবি স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন—
১. অবিলম্বে রাজ্যের সমস্ত অনুদানহীন মাদ্রাসায় মিড-ডে মিল চালু করতে হবে।
২. সমস্ত মাদ্রাসাকে সরকার-পোষিত (Government Aided) তালিকায় আনতে হবে।
৩. ১০ ডিসেম্বরের মধ্যেই ১১ মাসের বেতন বকেয়া মিটিয়ে দিতে হবে।
শিক্ষকদের হুঁশিয়ারি—“দাবি না মানলে ১০ ডিসেম্বরের পর সারা রাজ্যজুড়ে আরও জোরদার আন্দোলন হবে।”
‘উদাসীনতা নয়, অমানবিকতা’—শিক্ষকদের অভিযোগ
মাদ্রাসা শিক্ষকদের মতে, সংখ্যালঘু শিক্ষার ক্ষেত্রে রাজ্য সরকারের উদাসীনতা বহুদিন ধরেই চলে আসছে। মাদ্রাসার সংখ্যা বাড়ার প্রতিশ্রুতি থাকলেও, পুরনো প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সামর্থ্য বাড়ানোর দিকেও নজর দেওয়া হয়নি। সরকারিভাবে সাহায্য না থাকায় অনেক মাদ্রাসা বন্ধ হওয়ার মুখে।
এক শিক্ষক বলেন, “প্রতিদিন ক্লাস নিই, পরীক্ষা নিই, ছাত্র-ছাত্রীকে সামলাই। কিন্তু বেতন পাই না। শেষে তো সংসার চালাতে শিক্ষকতার পাশাপাশি অন্য কাজ করতে হচ্ছে অনেককে।”
মিছিল থামল ধর্মতলায়, জমা পড়ল স্মারকলিপি
মঙ্গলবার দুপুরের দিকে মাদ্রাসা শিক্ষকদের দীর্ঘ মিছিল শহরের ব্যস্ত রাস্তাগুলি দিয়ে এগোতে থাকে। কিন্তু ধর্মতলায় পুলিশ তা থামিয়ে দেয়। পরে শিক্ষকরা সেখান থেকেই নবান্নে স্মারকলিপি পাঠান। মুখ্যমন্ত্রীর বিশেষ আধিকারিক তাঁদের দাবিপত্র গ্রহণ করেন বলে জানা গেছে।
সরকারের প্রতিক্রিয়া এখনও নেই
শিক্ষকদের দাবি ক্রমেই জোরালো হলেও, রাজ্য সরকারের তরফে এখনো কোনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া মেলেনি। প্রশাসনিক স্তর থেকে কোনও সমাধানের ইঙ্গিতও মেলেনি এখনো।
শিক্ষকদের প্রশ্ন—“যে শিক্ষাপ্রণালী সংখ্যালঘু ছাত্রদের শিক্ষার দায়িত্ব নেয়, সেই কাঠামো যখনই ভেঙে পড়ছে, তখন সরকার নীরব কেন?”
শিক্ষকদের আশা—নবান্নে স্মারকলিপি জমা পড়ার পর মুখ্যমন্ত্রী সরাসরি হস্তক্ষেপ করবেন এবং আর্থিক সঙ্কট সমাধানের পথ খুলে দেবেন।
এখন নজর ১০ ডিসেম্বরের ডেডলাইনে। তার আগেই কি রাজ্য সরকার বকেয়া বেতনের সমস্যা মেটাবে, নাকি আরও বৃহত্তর আন্দোলনের পথে হাঁটবেন রাজ্যের মাদ্রাসা শিক্ষক-শিক্ষিকারা—সেটাই দেখার।








