বছরের পর বছর রাজনৈতিক দূরত্ব, তিক্ততা এবং চিটফান্ড মামলার ছায়া সত্ত্বেও ফের একবার কুণালের স্বাস্থ্যের খোঁজ নিতে ফোন করলেন পার্থ চট্টোপাধ্যায়। বুধবার বিকেলে হঠাৎই কুণাল ঘোষের ফোনে ভেসে উঠল প্রাক্তন মহাসচিবের নাম। তৃণমূল মুখপাত্রের হঠাৎ দুর্ঘটনার খবর শোনার পরেই তিনি যোগাযোগ করেন বলে জানা গিয়েছে। আর সেই কথোপকথনের মাঝেই পার্থের গলা কেঁপে ওঠে, আবেগে চোখের জলও আটকাতে পারেননি তিনি।
সোমবার কুণাল ঘোষ বাড়ির স্নানঘরে পা পিছলে পড়ে যান। তাঁর ডান পায়ের হাড় ভেঙে গেছে। ঠিক এই খবরই পার্থের কানে পৌঁছোয় সংবাদমাধ্যম এবং পরিচিতদের মাধ্যমে। ব্যক্তিগত সম্পর্ক একসময় কোথায় ছিল, আর আজ কোথায় দাঁড়িয়েছে — তার পরোয়া না করেই কুণালের স্বাস্থ্যের খোঁজ নিতে তিনি সরাসরি ফোন করেন। দলের বর্তমান মুখপাত্রকে এভাবে ফোন করা তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানেও নতুন আলো ফেলছে।
কুণালের স্বাস্থ্যের খোঁজ নিতে ফোন পার্থের, আবেগে নাকি কেঁদেও ফেললেন একদা মহাসচিব!
ফোনালাপে পার্থ প্রথমেই জানতে চান, কীভাবে দুর্ঘটনা ঘটল। কথা বলতে বলতে আবেগে ভেঙে পড়ে তিনি বলেন— তাঁর বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ ওঠা সত্ত্বেও তিনি নিজেকে নির্দোষ মনে করেন। দলের বড় অংশ তাঁকে ভুল বুঝছে বলে কুণালের কাছে আক্ষেপ করেন পার্থ। এমনকি নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতেও চেয়েছেন তিনি। সব মিলিয়ে, এই ফোনালাপ ছিল যথেষ্ট সংবেদনশীল এবং মানবিক।

ওই সূত্রের দাবি অনুযায়ী, কথোপকথনের সময় কুণালও তাঁকে আশ্বস্ত করেন। কুণাল বলেন, এখন এসব ভাবলে হবে না। নিজের শরীর এবং মানসিক স্বাস্থ্যই আগে দেখা প্রয়োজন। তিনি পার্থকে যত্ন নেওয়ার পরামর্শ দেন। এই অংশটুকুই দেখিয়ে দেয়, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও ব্যক্তিগত সম্পর্ক ভেঙে যায়নি।
এই বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে কুণাল ঘোষও স্বীকার করেছেন যে পার্থ তাঁকে ফোন করেছিলেন। তিনি বলেন, বহু বছরের পরিচয় তাঁদের। তাঁর দুর্ঘটনার খবর পেয়ে খোঁজ নিতে ফোন করেছিলেন প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী। সেখানে মানবিকতার জায়গাটাই বেশি ছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি। তবে রাজনৈতিক প্রসঙ্গে বিস্তারিত কিছু বলতে চাননি।
অতীতে চিটফান্ড মামলায় গ্রেফতার হয়েছিলেন কুণাল। জেলযাপন, সাসপেনশনের মতো অধ্যায় পেরিয়ে তাঁদের সম্পর্কের বরফ জমেছিল বলে দলের অন্দরে মত। একসময় পার্থ চট্টোপাধ্যায়ই ছিলেন তৃণমূলের মহাসচিব। কুণালের বিরুদ্ধে তির ছুড়েছিলেন মাঝেমধ্যেই। কিন্তু আজ সেই পার্থই সাসপেন্ডেড অবস্থায় দাঁড়িয়ে কুণালের স্বাস্থ্যের খোঁজ নিচ্ছেন, যা রাজনৈতিক মহলে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।
সাম্প্রতিক সময়েই নিয়োগ-কাণ্ডে জামিনে মুক্তি পেয়েছেন পার্থ। জেল থেকে বেরিয়ে দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে একটি চিঠি পাঠান তিনি। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সুব্রত বক্সীকেও পাঠান প্রতিলিপি। কেন তাঁকে সাসপেন্ড করা হয়েছে— তা জানতে চান তিনি। একই অভিযোগে অভিযুক্ত অন্য নেতাদের পাশে দল দাঁড়ালেও তাঁর ক্ষেত্রে কেন ব্যতিক্রম ঘটল— সেই আক্ষেপও ব্যক্ত করেন প্রাক্তন মহাসচিব।
এই পরিস্থিতির মাঝেই কুণালের স্বাস্থ্যের খোঁজ নিতে তাঁর ফোন করা রাজনৈতিক নয়, বরং মানবিক আচরণ বলেই মনে করছেন বহু নেতা-কর্মী। আবার অন্য একাংশ বলছে, সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করেছে কি? মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও রাজ্য রাজনীতিতে এই ফোনালাপ নিঃসন্দেহে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।







