কালীপুজোর আগেই কলকাতাগামী বিমানের টিকিটের দাম (Flight Ticket Price) সাধারণ যাত্রীদের নাগালের বাইরে চলে গেল। যেখানে মুম্বই থেকে কলকাতার ইকনমি ক্লাসের ভাড়া সাধারণত ৭–৮ হাজার টাকার মধ্যে ঘোরাফেরা করে, সেখানে এ বছর সেই দাম এক লাফে পৌঁছে গিয়েছে ২৭ হাজার টাকায়। শুধু মুম্বই নয়, বেঙ্গালুরু, দিল্লি ও হায়দরাবাদ থেকেও কলকাতায় আসার বিমানভাড়া উৎসবের মরসুমে রেকর্ড গতি তুলেছে।
অসামরিক বিমান পরিবহণ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ডিজিসিএ (DGCA) উৎসবের সময় ভাড়া সাধ্যের মধ্যে রাখার নির্দেশ দিয়েছিল। বিমান সংস্থাগুলিকে উড়ানের সংখ্যা বাড়ানোরও পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে পরিস্থিতি পুরোপুরি উল্টো। নির্দেশ জারির পরও Airfare বৃদ্ধি ঠেকানো যায়নি। যাঁরা উৎসবের সময় বাড়ি ফিরতে চাইছেন, তাঁদের গুনতে হচ্ছে কয়েক গুণ বেশি টাকা।
কালীপুজোর ছুটি ও ভাইফোঁটায় ভিড় বাড়ছে কলকাতাগামী রুটে
আগামী ২০ অক্টোবর সোমবার কালীপুজো। তার আগে সপ্তাহান্তে লম্বা ছুটি, সঙ্গে ভাইফোঁটা। দুর্গাপুজোয় অনেকেই বাড়ি আসতে না পারলেও এবার উৎসবে ফেরার পরিকল্পনা করেছেন। ফলে কলকাতাগামী বিমানের চাহিদা বিপুল হারে বেড়ে গিয়েছে। ট্র্যাভেল এজেন্টরা বলছেন, এ বছর বৃহস্পতিবার থেকেই টিকিটের চাহিদা উর্ধ্বমুখী।

মুম্বই–কলকাতা রুটে বৃহস্পতিবার ইকনমি ক্লাসের ভাড়া ছিল প্রায় ২৭ হাজার টাকা। শনিবার তা নেমেছে সামান্য, সাড়ে ২৬ হাজারে। যেখানে গড়ে এই টিকিটের দাম থাকে ৭–৮ হাজারের মধ্যে। বিজ়নেস ক্লাসের ভাড়াও রেকর্ড উচ্চতায়, সাধারণত ৩০–৩৫ হাজারের টিকিট এখন বিকোচ্ছে ৭০ হাজার টাকারও বেশি দামে।
বেঙ্গালুরু–দিল্লি–হায়দরাবাদ: ভাড়ার উল্লম্ফন সর্বত্র
কলকাতাগামী অন্যান্য বড় শহরের টিকিটের দামও চমকে দিচ্ছে। বেঙ্গালুরু থেকে যেখানে সাধারণত ৭–৮ হাজার টাকায় ফ্লাইট মেলে, সেখানে বৃহস্পতিবার টিকিটের দাম পৌঁছেছিল ১৫,৫০০ টাকায় এবং শনিবার ১৮,৫০০ টাকার কাছাকাছি। দিল্লি–কলকাতা রুটেও একই চিত্র। সপ্তাহান্তে ভাড়া ৭ হাজার থেকে বেড়ে ১৫ হাজারে উঠেছে। হায়দরাবাদ থেকেও যাত্রীদের গুনতে হচ্ছে ১৮ হাজার টাকার বেশি।
আশ্চর্যজনকভাবে, এই বাড়তি ভাড়া শুধু কলকাতায় আসার পথে। কলকাতা থেকে মুম্বই, দিল্লি বা বেঙ্গালুরু যাওয়ার বিমানভাড়া তুলনামূলক অপরিবর্তিত রয়েছে।
ট্র্যাভেল ইন্ডাস্ট্রির ব্যাখ্যা
ট্র্যাভেল এজেন্টস ফেডারেশন অফ ইন্ডিয়া (পূর্বাঞ্চলীয়)-র আধিকারিক অনিল পঞ্জাবি জানিয়েছেন, “পরিবারের সঙ্গে দীপাবলি–কালীপুজো কাটাতে বাইরে থেকে বিপুল সংখ্যক যাত্রী শহরে ফিরছেন। বৃহস্পতিবার থেকেই টিকিটের চাহিদা হু-হু করে বেড়েছে। গত বছরের তুলনায় এ বছর ভাড়ার বৃদ্ধি কিছুটা কম হলেও দাম এখনও অস্বাভাবিক।”
তিনি জানান, গত বছর মুম্বই–কলকাতা রুটে ভাড়া ছুঁয়েছিল ৪০ হাজার টাকা। এ বছর তা নেমে এসেছে ২৭ হাজারের আশেপাশে, কিন্তু এটাও সাধারণ মানুষের পক্ষে বেশ চড়া।
ট্র্যাভেল এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশন অফ ইন্ডিয়ার মানব সোনি বলেন, “একদিন আগেই যে টিকিট আমি ৮ হাজারে কেটেছিলাম, আজ তার দাম ৩০ হাজার।” তাঁর মতে, DGCA নির্দেশিকায় ভাড়ার কোনও সীমা (price cap) নির্ধারণ না করায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
DGCA নির্দেশিকা কার্যকর হলো না কেন?
DGCA স্পষ্ট করে বলেছিল যে উৎসবের সময় ভাড়া নাগালের মধ্যে রাখতে সংস্থাগুলিকে অতিরিক্ত ফ্লাইট চালাতে হবে। সে মতো দেড় থেকে দু’হাজার বাড়তি উড়ান চালানোর আশ্বাস দিয়েছিল সংস্থাগুলি। কিন্তু কলকাতা বিমানবন্দরে এর খুব একটা প্রতিফলন দেখা যায়নি।
বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার কলকাতায় ৩৪২টি অন্তর্দেশীয় ফ্লাইট ওঠানামা করেছে। মোট যাত্রীসংখ্যা ছিল ৫৩,৭৩২ জন। অর্থাৎ, ফ্লাইটের সংখ্যা বাড়লেও চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ মেলেনি। ফলে দামের লাগাম ছিঁড়ে গিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মত: নীতি পরিবর্তনের সময় এসেছে
ভোক্তা অধিকার সংগঠনগুলির মতে, উৎসবের সময় বারবার এমন Airfare বৃদ্ধি সাধারণ যাত্রীদের জন্য গভীর সংকট তৈরি করছে। বিশেষ করে যারা কাজ বা পড়াশোনার সূত্রে বাইরে থাকেন, তাঁদের জন্য বাড়ি ফেরা হয়ে যাচ্ছে বিলাসিতা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, DGCA-র নির্দেশ যথেষ্ট নয়— ভাড়ার উপরে স্পষ্ট সীমা নির্ধারণ না করা হলে বিমান সংস্থাগুলি বাজারের চাহিদাকে কাজে লাগিয়ে অনিয়ন্ত্রিত দাম তুলবেই। নীতিতে পরিবর্তন আনাই এখন একমাত্র পথ।
পরিস্থিতি: চড়া ভাড়া, অচল সমাধান
কালীপুজোর আগে কলকাতাগামী বিমানের ভাড়া বৃদ্ধি শুধু উৎসবযাত্রীদেরই নয়, পর্যটন ও ব্যবসায়িক ক্ষেত্রকেও প্রভাবিত করছে। DGCA ও কেন্দ্রীয় সরকারের নজরদারির মধ্যেও যে বাস্তব পরিস্থিতি অপরিবর্তিত, তা এবার আবার স্পষ্ট হয়ে গেল।
যাত্রীদের একাংশের দাবি, টিকিটের এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি রুখতে দৃঢ় আইনগত কাঠামো প্রয়োজন। না হলে প্রতি বছর উৎসবের মরসুমে একই ছবি দেখা যাবে।



