বিধানসভা নির্বাচন আর মাত্র কয়েক মাস দূরে। তার আগেই নবান্নে সাংবাদিক বৈঠকে রাজ্যের ১৫ বছরের কাজের খতিয়ান তুলে ধরলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর ভাষায়, এই ‘উন্নয়নের পাঁচালি’ শুধু একটি রিপোর্ট নয়, বরং পশ্চিমবঙ্গের পরিবর্তনের দলিল। তিনি দাবি করেন, ২০১১ থেকে ২০২৪—এই ১৫ বছরে বাংলা দেশের সামনে উন্নয়নের মডেল হয়ে উঠেছে।
বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী জানান, রাজ্যের জিডিপি বৃদ্ধি হয়েছে ৪.৪১ গুণ, কর আদায় বেড়েছে পাঁচ গুণ। উন্নয়নমূলক প্রকল্প, সামাজিক সুরক্ষা ও কর্মসংস্থান প্রসারে রাজ্য সরকারের সাফল্যকে তিনি সামনে আনেন—যেখানে কর্মশ্রী ও লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্পকে তিনি ‘বাংলার গর্ব’ বলে উল্লেখ করেন।
কর্মশ্রী–লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের বিস্ময়কর সাফল্য, ১৫ বছরের উন্নয়নের দলিল পেশ করলেন মুখ্যমন্ত্রী
কর্মশ্রী প্রকল্প—কর্মসংস্থানে মমতা সরকারের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার
মুখ্যমন্ত্রীর মতে, বাংলায় দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও গ্রামীণ কর্মসংস্থান তৈরির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা নিয়েছে কর্মশ্রী প্রকল্প। ১০০ দিনের কাজের এই রাজ্যীয় সংস্করণে প্রতিদিনের গড় কর্মদিবস এখন ৭০ দিন—যা কেন্দ্রীয় প্রকল্পের তুলনায় বেশি।
তিনি জানান, গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন থেকে শুরু করে নির্মাণ প্রকল্প—সব ক্ষেত্রেই কর্মশ্রী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, গত ১৫ বছরে কর্মসংস্থানে প্রায় ৪০ লক্ষ মানুষের বেকারত্ব কমেছে।
লক্ষ্মীর ভাণ্ডার—মহিলাদের আর্থিক স্বাধীনতার মাইলফলক
‘উন্নয়নের পাঁচালি’র কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার। মুখ্যমন্ত্রী জানান, এই প্রকল্পের সুবিধা পেয়েছেন ২ কোটি ২১ লক্ষ মহিলা, যার জন্য ব্যয় হয়েছে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা। তাঁর দাবি, মহিলাদের হাতে মাসিক আর্থিক সুরক্ষা পৌঁছে দেওয়া—বাংলার সামাজিক উন্নয়নের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়।
বহু অর্থনীতিবিদের মতে, মহিলাদের ব্যয়ক্ষমতা বৃদ্ধি গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করেছে।
দুয়ারে রেশন থেকে স্বাস্থ্যসাথী—মানুষের ঘরে পৌঁছে গেছে পরিষেবা
রাজ্যের অন্যতম সফল জনমুখী প্রকল্প ‘দুয়ারে রেশন’। মুখ্যমন্ত্রী জানান, বর্তমানে ৭ কোটি ৪১ লক্ষ মানুষ নিয়মিত এই পরিষেবা পাচ্ছেন। আর স্বাস্থ্যসাথীর আওতায় উপকৃত হয়েছেন ২ কোটি ৪৫ লক্ষ পরিবার। তিনি দাবি করেন, বাংলার স্বাস্থ্য কাঠামো এখন দেশসেরা মডেলের অন্যতম।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, রাজ্যে দারিদ্রসীমার উপরে উঠেছেন ১ কোটি ৭২ লক্ষ মানুষ—যা গত দশকে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন।

শিল্প ও অবকাঠামো—বিনিয়োগে নজরকাড়া উন্নয়ন
মুখ্যমন্ত্রীর মতে, শিল্প ক্ষেত্রে গত ১৫ বছরে রাজ্যে বড় পরিবর্তন এসেছে।
তিনি জানান—
আসানসোল–দুর্গাপুর শিল্প তালুকে বিনিয়োগ হয়েছে ২২ হাজার কোটি।
বেঙ্গল সিলিকন ভ্যালিতে রয়েছে ২০০০ সংস্থা, কর্মসংস্থান ২ লক্ষ।
অর্থনৈতিক করিডর প্রকল্পে এসেছে আরও ১ লক্ষ কর্মসংস্থান।
পরিকাঠামো উন্নয়নেও রাজ্য খরচ করেছে ৭০ হাজার কোটি টাকা, পঞ্চায়েত থেকে রাজ্য সড়ক—দুই ক্ষেত্রেই হয়েছে বড়সড় অগ্রগতি। ইতিমধ্যে ৫ হাজার কিলোমিটার পথশ্রী রাস্তা সম্পূর্ণ হয়েছে, লক্ষ্য ৭ হাজার কিলোমিটার।
গঙ্গাসাগর সেতু নির্মাণে বরাদ্দ হয়েছে ১,৭০০ কোটি টাকা, যার কাজ শুরু হলে পর্যটন ও যোগাযোগ ব্যবস্থার বড় উন্নতি হবে বলে মত বিশেষজ্ঞদের।
শিক্ষা ও সমাজকল্যাণ—কন্যাশ্রী, রূপশ্রী ও বাংলার বাড়ি প্রকল্প
কন্যাশ্রী প্রকল্পে উপকৃত হয়েছেন ১ কোটির বেশি কন্যা, যা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও প্রশংসা কুড়িয়েছে।
রূপশ্রীর জন্য বরাদ্দ হয়েছে ৫৫৯৮ কোটি টাকা, যা আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা পরিবারগুলিকে সহায়তা করেছে।
এ ছাড়াও মুখ্যমন্ত্রী জানান, জেলায় জেলায় তৈরি হচ্ছে শপিং মল এবং কর্মতীর্থ, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করছে।
মুখ্যমন্ত্রীর সারসংক্ষেপ—“বাংলা এখন দেশের মডেল”
বৈঠকের শেষে মুখ্যমন্ত্রী বলেন,
“বাংলার উন্নয়ন কারা দেখতে চায় না, তা মানুষ জানে। কিন্তু সত্যি কথা হল—বাংলা আজ সারা দেশের কাছে মডেল।”
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্বাচনের আগে এই উন্নয়নের পাঁচালি তৃণমূলের প্রচারের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।







