বাংলা সিনেমার বর্ষীয়ান অভিনেতা কল্যাণ চট্টোপাধ্যায় আর নেই। ৮১ বছর বয়সে দীর্ঘ রোগভোগের পর রবিবার রাতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন এই প্রবীণ শিল্পী। উত্তমকুমারের সহ-অভিনেতা হিসেবে তাঁর সুবিশাল কাজ ও ব্যক্তিত্ব তাঁকে শিল্পীমহলে বিশেষ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছিল। তাঁর মৃত্যুর খবরে গভীর শোক নেমে এসেছে টলিউডে। শিল্পীজীবনের সাত দশক জুড়ে যে উজ্জ্বল উপস্থিতি তিনি তৈরি করেছিলেন, তা আজ বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে রইল।
আর্টিস্ট ফোরামের তরফে সোহন বন্দ্যোপাধ্যায় ও দিগন্ত বাগচী জানিয়েছেন, গত কয়েক মাস ধরেই নানা জটিল অসুস্থতায় ভুগছিলেন কল্যাণ। ম্যালেরিয়া, টাইফয়েড-সহ দীর্ঘস্থায়ী রোগ তাঁকে প্রায় সম্পূর্ণভাবে শয্যাশায়ী করে রাখে। হাসপাতালের বিছানাতেই চলছিল তাঁর লড়াই। অভিনয় থেকে তিনি বহু দিন দূরে ছিলেন, কিন্তু সহকর্মীদের স্নেহ-সমর্থন তাঁর পাশে থেকে গেছে শেষ সময় পর্যন্ত। সোহনের কথায়, আর্টিস্ট ফোরামের সদস্যরা যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন তাঁকে সহযোগিতা করতে।


অভিনেতা কল্যাণ চট্টোপাধ্যায়ের প্রয়াণে শোক, শেষ হল এক যুগের অধ্যায়
খবর পাওয়া গেছে, রবিবার রাতে হাসপাতাল থেকে সরাসরি তাঁর মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় কেওড়াতলা মহাশ্মশানে। সেখানেই সম্পন্ন হয়েছে তাঁর শেষকৃত্য। শিল্পী সমাজ, অনুরাগী ও চলচ্চিত্র-প্রেমীরা সোশ্যাল মিডিয়ায় শোক প্রকাশ করেছেন।
বাংলা সিনেমায় তাঁর যাত্রা শুরু পুণে ফিল্ম ইনস্টিটিউট থেকে অভিনয় প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেই। প্রথম ছবিতে সুযোগ পান কিংবদন্তি পরিচালক তপন সিংহের ‘আপনজন’-এ। এরপর আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। দ্রুতই তিনি হয়ে ওঠেন পরিচালকদের অন্যতম ভরসার মুখ। ‘সাগিনা মাহাতো’, ‘ধন্যি মেয়ে’—এ রকম বহু কালজয়ী ছবিতে তিনি অমর চরিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন। ৪০০-রও বেশি ছবি তাঁর অভিনয় যাত্রার সাক্ষী।
তপন সিংহ ও অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়ের প্রিয় অভিনেতাদের তালিকায় তাঁর নাম ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সত্যজিৎ রায়ের ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’-তেও তাঁর অভিনয় প্রশংসা কুড়িয়েছিল। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়, সন্তু মুখোপাধ্যায়, দীপঙ্কর দে, রঞ্জিত মল্লিক—এই সব সমসাময়িক শিল্পীদের সঙ্গে তিনি কাজ করেছেন সমান দক্ষতার সঙ্গে।



বড়পর্দার পাশাপাশি ছোটপর্দা ও ডিজিটাল সিরিজেও দুর্দান্ত অভিনয় করেছেন তিনি। হিন্দি সিনেমা ‘কহানি’-তে তাঁর উপস্থিতি নজর কাড়ে। জনপ্রিয় সিরিজ ‘তানসেনের তানপুরা’-তেও তাঁর অভিনয় দর্শকদের মনে দাগ কেটেছিল। সিনেমা, সিরিয়াল বা ওয়েব—প্রতিটি মাধ্যমেই তিনি ছিলেন সমান সাবলীল।
কল্যাণ চট্টোপাধ্যায় শুধু একজন অভিনেতাই নন, ছিলেন এক অমূল্য ব্যক্তিত্ব। বাংলা চলচ্চিত্রে রসিকতা, সহজতা ও বাস্তব অভিনয়ের যে ধারা তিনি তৈরি করেছিলেন, তা আগামী প্রজন্মের শিল্পীদের কাছে প্রেরণা হয়ে থাকবে। তাঁর প্রয়াণে বাংলা চলচ্চিত্র হারাল এক যুগের সাক্ষীকে, এক অনন্য অভিনেতাকে।
আজ তাঁর স্মৃতিতে চলচ্চিত্র জগত নতজানু। তাঁর অবদান, তাঁর কাজ এবং তাঁর মানবিকতা বাংলা সিনেমার ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবে।








