মায়ের আরাধনায় নজরুল থেকে রামপ্রসাদের সুর, শ্যামাসঙ্গীত ছাড়া কালীপুজো অসম্পূর্ণ

উনবিংশ শতকের কলকাতার জমিদারবাড়ি থেকে আজকের আলো ঝলমলে কালীপুজো— মায়ের আরাধনায় এখনও অনিবার্য শ্যামাসঙ্গীতের সুরে ভরে ওঠে বাঙালির হৃদয়।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

অর্ক সানা: কালীপুজো ও শ্যামাসঙ্গীত— বাঙালির আত্মার উৎসব। বাঙালির কালীপুজো শুধুমাত্র ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি সংস্কৃতি, বিশ্বাস এবং ভক্তির সমন্বয়। শ্যামাসঙ্গীত ছাড়া কালীপুজো ভাবাই যায় না। রামপ্রসাদ সেন, বামাখ্যাপা, কমলাকান্ত, নজরুল ইসলাম— এঁদের সৃষ্ট গান মায়ের আরাধনাকে করেছে আরও হৃদয়স্পর্শী।

উনবিংশ শতকে কলকাতার জমিদার বাড়িগুলিতে কালীপুজো (Kali Puja)-র প্রচলন শুরু হয়। তান্ত্রিক সাধনা থেকে সমাজজীবনে দেবীর স্থান পাওয়ার পেছনে বড় ভূমিকা রয়েছে রামকৃষ্ণদেব ও রামপ্রসাদের মতো সাধকদের। তাঁদের কণ্ঠে ও কলমে গাওয়া শ্যামাসঙ্গীত (Shyama Sangeet) আজও কালীপুজোর অপরিহার্য অংশ।

দিগম্বরী মায়ের অসীম শক্তির আরাধনা
অসীম শক্তির প্রতীক মা কালী, যিনি দেবী মহামায়ার চণ্ড রূপ। রক্তবীজ দমন শেষে দেবী যখন বিজয় নৃত্যে মেতে ওঠেন, তখন মহাদেব নিজেকে তাঁর পায়ের তলে সমর্পণ করেন— সৃষ্টি রক্ষার তরে। দেবী কালী তখনই বিশ্বজগতে ‘মহাশক্তি’-র প্রতীক হয়ে ওঠেন। তাঁর দিগম্বর রূপ শক্তির সীমাহীনতাকেই প্রকাশ করে।

মায়ের আরাধনায় নজরুল থেকে রামপ্রসাদের সুর, শ্যামাসঙ্গীত ছাড়া কালীপুজো অসম্পূর্ণ
তারাপীঠের কালী

কলকাতার কালীঘাট, দক্ষিণেশ্বর, ঠনঠনিয়া, কাশীপুর, চিৎপুর— সর্বত্রই মায়ের নানা রূপে পূজা হয়। কালীঘাটের কালী (Kalighat Kali Temple) মায়ের একান্ন পীঠের অন্যতম, যেখানে দেবীর আঙুল পড়েছিল। অন্যদিকে, রানি রাসমণির প্রতিষ্ঠা করা দক্ষিণেশ্বর কালীমন্দির আজও কোটি ভক্তের তীর্থস্থান।

শ্যামাসঙ্গীত: সাধনার সুর ও ভক্তির মন্ত্র
“মন রে কৃষিকাজ জানো না”— এই এক পংক্তিতেই লুকিয়ে আছে রামপ্রসাদ সেনের তত্ত্বজ্ঞান। তাঁর শ্যামাসঙ্গীত বাংলার আধ্যাত্মিক সংগীতকে দিয়েছে অমর রূপ। নরবলি দিতে গিয়ে রামপ্রসাদের স্থলে মা কালীকে দেখে রঘু ডাকাতের জীবন পরিবর্তিত হওয়া কেবল ভক্তির গল্প নয়, এটি বাঙালির বিশ্বাসের প্রতিচ্ছবি।

নজরুল ইসলামের শ্যামাসঙ্গীতে ভক্তির নতুন দিশা
বল রে জবা বল, কোন সাধনায় পেলি শ্যামা মায়ের চরণতল’— এই লাইনটি কেবল একটি গান নয়, এটি ধর্মের সীমানা ভেঙে মানবতার সুর। কাজী নজরুল ইসলাম দেখিয়েছেন, মা কালী কেবল হিন্দুদের দেবী নন; তিনি শক্তির প্রতীক, যাঁর কাছে সকল ধর্মের মানুষ সমান। সুফি সাধকদের মধ্যেও কালীপুজোর প্রভাব দেখা যায়— ইটাওয়ার সৈয়দ বাবার মাজার থেকে পাভাগড়ের সাদন শাহ পর্যন্ত।

মায়ের আরাধনায় নজরুল থেকে রামপ্রসাদের সুর, শ্যামাসঙ্গীত ছাড়া কালীপুজো অসম্পূর্ণ
কালীঘাটের কালী

বামাখ্যাপা: তারাপীঠের মহাশ্মশানে মায়ের সঙ্গে মিলন
তারাপীঠের মহাশ্মশানে বসে মায়ের সঙ্গে কথা বলা বামাখ্যাপা আজও কিংবদন্তি। প্রচলিত ধর্মের গণ্ডি ভেঙে তিনি মা তারার আরাধনা করেছেন নিজের মতো করে। কেউ তাঁকে বলেছে ‘খ্যাপা’, আবার কেউ তাঁকে মানে ‘জীবন্ত সাধক’। আজও তাঁর পুজোর স্থানে কোটি ভক্তের সমাগম ঘটে, যেখানে অনুভব করা যায় ভক্তি, তন্ত্র ও প্রেমের এক অবিনাশী সংমিশ্রণ।

রামকৃষ্ণ পরমহংস: সহজ ভক্তির পথের প্রচারক
হুগলির কামারপুকুর থেকে উঠে এসে দক্ষিণেশ্বর কালীমন্দিরে মা ভবতারিণীর পূজারি হন গদাধর। সেখান থেকেই তিনি হয়ে ওঠেন সাধক রামকৃষ্ণ পরমহংস। তাঁর “যত মত তত পথ” ভাবধারা হিন্দুধর্মে এনে দেয় এক নতুন দার্শনিক জাগরণ। স্ত্রী সারদা দেবীকে জগদম্বারূপে পুজো করে তিনি মানবতার ভক্তির এক নতুন ধারা সৃষ্টি করেন।

মায়ের আরাধনায় নজরুল থেকে রামপ্রসাদের সুর, শ্যামাসঙ্গীত ছাড়া কালীপুজো অসম্পূর্ণ
ঠনঠনিয়া কালীবাড়ির কালী

কলকাতার কালীবাড়ি ও বিপ্লবের ইতিহাস
কলকাতার পাথুরিয়াঘাটার বিখ্যাত কালীবাড়ি (Pathuriaghata Kalibari)-র সঙ্গে যুক্ত ছিলেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু। ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবীরা এই কালীবাড়িকেই করেছিলেন গোপন বৈঠকের স্থান। পুরুলিয়া, মেদিনীপুর, ঝালদা— সর্বত্র কালীপুজো শুধু ধর্মীয় নয়, হয়ে উঠেছিল স্বাধীনতার প্রতীক। কালী কলকাত্তাওয়ালি (Kali Kalkattawali) নামটি তাই আজও গর্বের সঙ্গে উচ্চারিত হয়।

আধুনিক কালীপুজো: আলোর উৎসব ও সবুজ ভাবনা
আজকের দিনে কালীপুজো মানেই আলোর ঝলকানি, বাজির রোশনাই এবং প্রতিযোগিতার উৎসব। তবে পরিবেশ রক্ষায় আজ মানুষ ঝুঁকছে সবুজ বাজি (Green Firecrackers)-র দিকে। যদিও কালীপুজোর আসল আকর্ষণ এখনও মায়ের আরাধনা, জবা ফুলের পবিত্র লাল রঙ, আর শ্যামাসঙ্গীতের সুরে ভক্তির আবহ।

মা কালী শক্তির প্রতীক, যিনি আমাদের শেখান বিনয়, সহিষ্ণুতা ও আত্মসমর্পণ।
আর তাই আজও, যুগ বদলালেও বাঙালি গেয়ে ওঠে—
“শ্যামা মায়ের চরণতল, ও মন রে বল রে জবা বল।”

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহুর্তে। আমাদের ফলো করুন
Google News Google News

সদ্য প্রকাশিত