তালিবান বিদেশমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকির ভারত সফরের মাঝেই কাবুলে বিস্ফোরণ ঘটায় তীব্র কূটনৈতিক আলোড়ন। বৃহস্পতিবার রাতে আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলে পরপর দু’টি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। স্থানীয় সূত্রে খবর, রাতের অন্ধকারে কেঁপে ওঠে শহরের একাংশ।
তালিবান সরকারের মুখপাত্র জাবিউল্লাহ মুজাহিদ জানিয়েছেন, বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটলেও এখনও পর্যন্ত হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, “ঘটনার তদন্ত শুরু হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং আপাতত সবকিছু ঠিক আছে।”
এই হামলার সময় এবং প্রেক্ষাপট দু’টিই এখন আন্তর্জাতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ একই সময়ে আফগান বিদেশমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকি ভারত সফরে রয়েছেন।
কাবুল বিস্ফোরণ ঘিরে পাকিস্তানের নাম উঠে এল আলোচনায়
আফগান সংবাদমাধ্যমের একাংশে দাবি, এই হামলায় পাকিস্তানের জড়িত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। কিছু রিপোর্টে সরাসরি বলা হয়েছে, পাকিস্তানি বিমান বাহিনী আফগান সীমান্ত এলাকায় বিমান হামলা চালিয়েছে, যার লক্ষ্য ছিল তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান (TTP)-এর নেতা নূর ওয়ালি মাসুদ।
তবে টোলো নিউজ জানিয়েছে, নূর ওয়ালি মাসুদ নিজেই একটি অডিও বার্তায় হামলার দাবি নস্যাৎ করেছেন। তিনি বলেছেন, “আমার উপর কোনও বিমান হামলা হয়নি, আমি সম্পূর্ণ নিরাপদ।” ফলে, হামলার উৎস ও উদ্দেশ্য নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে আন্তর্জাতিক মহলে।
তালিবান সরকারের প্রতিক্রিয়া ও তদন্ত
তালিবান কর্মকর্তারা এবং আফগান সাংবাদিকদের একাংশও পাকিস্তানের বিমান হামলার দাবি অস্বীকার করেছেন। তারা জানিয়েছে, এখনই নিশ্চিত করে কিছু বলা সম্ভব নয়, তবে তদন্ত চলছে। তালিবান প্রশাসন ইতিমধ্যেই নিরাপত্তা বাহিনীকে ঘটনাস্থলে পাঠিয়েছে এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ যাচাই করছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বিস্ফোরণ এমন এক সময়ে ঘটেছে, যখন আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের সম্পর্ক ক্রমেই তিক্ত হয়ে উঠছে। সীমান্তে সংঘর্ষ, অনুপ্রবেশ ও জঙ্গি গোষ্ঠী নিয়ে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে টানাপোড়েন চলছে।
ভারত সফরে আফগান বিদেশমন্ত্রী, আলোচনায় দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক
অন্যদিকে, আফগান বিদেশমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকি বর্তমানে ভারত সফরে রয়েছেন। আজই তাঁর সঙ্গে ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর-এর বৈঠক হওয়ার কথা। দুই দেশের মধ্যে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, বাণিজ্য এবং মানবিক সহায়তা নিয়ে আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে কাবুল বিস্ফোরণ নতুন করে আন্তর্জাতিক নজর কেড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি নিছক নিরাপত্তা ঘটনা নয়, বরং আঞ্চলিক কূটনৈতিক ভারসাম্যের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
বিশ্লেষণ ও ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
আফগানিস্তান এখন এমন এক অবস্থানে রয়েছে যেখানে পাকিস্তান, ভারত, ইরান ও চীন — প্রত্যেকেরই কৌশলগত স্বার্থ জড়িয়ে আছে। তাই কাবুলের এই বিস্ফোরণকে শুধুমাত্র নিরাপত্তা ঘটনার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা ভুল হবে না।
তালিবান শাসন প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ইসলামাবাদের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক বারবার ওঠানামা করেছে। টিটিপি (TTP) গোষ্ঠীর উপস্থিতি পাকিস্তানের জন্য সরাসরি হুমকি, এবং ইসলামাবাদ সেই হুমকির মোকাবিলায় সীমান্ত পেরিয়ে অভিযান চালাতে পারে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
কাবুল বিস্ফোরণ এবং পাকিস্তানের নাম জড়ানো ঘটনাটি শুধু আফগানিস্তান নয়, সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক ভারসাম্যকে নাড়া দিয়েছে। তদন্ত শেষ না হলেও, এই ঘটনার সময়কাল—তালিবান বিদেশমন্ত্রীর ভারত সফরের মাঝেই ঘটেছে—এটি নিঃসন্দেহে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তাৎপর্যপূর্ণ ইঙ্গিত রেখে গেল।



