নজরবন্দি ব্যুরো: ঝাড়খণ্ডের সরকারি নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগে সোমবার ফের উত্তাল রাঁচী। ‘বিধানসভা মার্চ’-এর ডাক দিয়ে পথে নামলেন হাজার হাজার পড়ুয়া ও চাকরিপ্রার্থী। ব্যারিকেড ভেঙে এগোনোর চেষ্টা ঘিরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। আন্দোলনকারীদের থামাতে পুলিশ জলকামান ব্যবহার করেছে বলে অভিযোগ। একই দিনে মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেনের (Hemant Soren) বাসভবনের সামনে সিবিআই তদন্তের দাবিতে অবস্থান শুরু করে বিজেপি। সেখানে আটক হন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা বিরোধী দলনেতা বাবুলাল মারাণ্ডি (Babulal Marandi) এবং দলের কয়েকজন নেতা।
সরকারি নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়মের তদন্ত সিবিআইয়ের হাতে তুলে দেওয়া, নিয়োগ পরীক্ষার পদ্ধতিতে সংস্কার এবং পরীক্ষার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবিতে বেশ কিছুদিন ধরেই আন্দোলন চালিয়ে আসছেন পড়ুয়ারা। সরকারপক্ষের সঙ্গে তিন দফা বৈঠক হলেও আন্দোলনকারীদের মূল দাবিগুলির বিষয়ে এখনও সমাধানসূত্র মেলেনি বলে তাঁদের দাবি।
সোমবার সেই অচলাবস্থার মধ্যেই পুরনো বিধানসভা থেকে নতুন বিধানসভা পর্যন্ত ‘মার্চ’-এর ডাক দেওয়া হয়। হাতে ব্যানার, প্ল্যাকার্ড এবং মুখে স্লোগান নিয়ে রাঁচীর রাস্তায় নামেন পড়ুয়া ও চাকরিপ্রার্থীরা। তাঁদের লক্ষ্য ছিল বিধানসভা পর্যন্ত পৌঁছে সরকারের কাছে নিজেদের দাবি তুলে ধরা।
মিছিল এগোতে শুরু করার পর একাধিক জায়গায় পুলিশি ব্যারিকেডের মুখে পড়েন আন্দোলনকারীরা। ব্যারিকেড টপকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন অনেকে। প্রায় আধ ঘণ্টা মিছিল চলার পর বিধানসভা কমপ্লেক্স থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে জগন্নাথ মন্দিরের কাছে তাঁদের আটকে দেওয়া হয় বলে খবর।

সেখানেই রাস্তায় বসে পড়েন আন্দোলনকারীরা। অনশনরত ছাত্রনেতা দেবেন্দ্রনাথ মাহাতোও অ্যাম্বুল্যান্সে করে আন্দোলনস্থলে পৌঁছন। দীর্ঘদিন ধরে অনশন চালিয়ে আসা দেবেন্দ্রনাথের শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়েছে বলে আন্দোলনকারীদের দাবি। তাঁর উপস্থিতি আন্দোলনের আবেগ আরও বাড়িয়ে দেয়।
এর পর ফের ব্যারিকেড সরিয়ে বিধানসভার দিকে এগোনোর চেষ্টা হলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়। পুলিশ জলকামান ব্যবহার করে মিছিল ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করেছে বলে অভিযোগ। তবে আন্দোলনকারীদের একাংশ জলকামান উপেক্ষা করেই এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি নিয়ে একাধিক ছবি ও ভিডিয়োও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়েছে। তবে সেই ভিডিয়োগুলির স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
আন্দোলনকারীদের মূল ক্ষোভ ঝাড়খণ্ডের নিয়োগ পরীক্ষা ঘিরে। তাঁদের অভিযোগ, বিভিন্ন সরকারি চাকরির পরীক্ষায় অনিয়ম হয়েছে এবং গোটা প্রক্রিয়ার উপর আস্থা ফেরাতে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। সেই কারণেই তাঁরা সিবিআই তদন্তের দাবিতে অনড়।
পড়ুয়াদের দাবি শুধু তদন্তেই সীমাবদ্ধ নয়। নিয়োগ পরীক্ষার পদ্ধতিতে কাঠামোগত সংস্কার, স্বচ্ছতা এবং ভবিষ্যতে পরীক্ষার্থীদের আস্থা ফেরানোর জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও রয়েছে। আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, শুধু পরীক্ষা বাতিল বা প্রশাসনিক পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়; অনিয়মের পিছনে কারা রয়েছে, সেটিও প্রকাশ্যে আসা দরকার।
অন্যদিকে, একই ইস্যুকে সামনে রেখে মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেনের সরকারি বাসভবনের সামনে অবস্থান শুরু করে বিজেপি। বিরোধী দলনেতা বাবুলাল মারাণ্ডি, বিজেপি নেতা আদিত্য সাহু (Aditya Sahu)-সহ দলীয় কর্মীরা সিবিআই তদন্তের দাবি জানান। পুলিশ তাঁদের আটক করে বলে বিজেপির তরফে অভিযোগ করা হয়েছে।
বাবুলাল মারাণ্ডির বক্তব্য, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে পড়ুয়ারা রাস্তায় আন্দোলন করলেও সরকার তাঁদের দাবির বিষয়ে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে না। তাঁর অভিযোগ, নিয়োগ পরীক্ষার অনিয়মের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি এড়িয়ে যাচ্ছে হেমন্ত সোরেনের সরকার।
এই অভিযোগ অবশ্য মানতে নারাজ শাসকপক্ষ। ঝাড়খণ্ড সরকারের মন্ত্রীদের বক্তব্য, পড়ুয়াদের একাধিক দাবি মেনে নেওয়া হয়েছে এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সংস্কারের পরিকল্পনাও রয়েছে। তবে ঝাড়খণ্ড এসএসসি-সিজিএল পরীক্ষা বাতিলের মতো কিছু বিষয়ে আদালতের নির্দেশ জড়িত থাকায় সরকার একতরফাভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না বলেও সরকারের তরফে জানানো হয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছে, পড়ুয়ারা শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করলে তাঁদের বিরুদ্ধে জলকামান বা লাঠিচার্জের প্রয়োজন নেই। কিন্তু সোমবারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, ব্যারিকেড ভেঙে এগোনোর সময় তাঁদের লক্ষ্য করে জলকামান ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে সরকারের বক্তব্য এবং আন্দোলনকারীদের অভিযোগের মধ্যে স্পষ্ট মতবিরোধ তৈরি হয়েছে।
রাজ্যের মন্ত্রী সুদিব্য সোনু (Sudivya Sonu) আবার অভিযোগ করেছেন, পড়ুয়াদের আন্দোলনকে রাজনৈতিক ভাবে প্রভাবিত করার চেষ্টা হচ্ছে। অর্থাৎ নিয়োগ পরীক্ষার অনিয়মের অভিযোগের পাশাপাশি আন্দোলনের রাজনৈতিক চরিত্র নিয়েও এখন চাপানউতোর শুরু হয়েছে।
এর মধ্যেই ঝাড়খণ্ডের নিয়োগ পরীক্ষাকে ঘিরে তদন্তের পরিধি আরও বাড়ছে। বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগের প্রেক্ষিতে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ED) তদন্ত শুরু করেছে বলেও সোমবারের প্রতিবেদনে জানা গিয়েছে।
সব মিলিয়ে রাঁচীর রাজপথে সোমবারের ঘটনা ঝাড়খণ্ডের নিয়োগ পরীক্ষা বিতর্ককে নতুন মাত্রা দিল। একদিকে সিবিআই তদন্ত ও নিয়োগ ব্যবস্থায় সংস্কারের দাবিতে পড়ুয়াদের আন্দোলন, অন্যদিকে সেই দাবিকে কেন্দ্র করে বিজেপির রাজনৈতিক চাপ—দুইয়ের চাপে হেমন্ত সোরেন সরকার এখন বড় পরীক্ষার মুখে। আন্দোলনকারীরা যে এখনই পিছিয়ে যাওয়ার অবস্থায় নেই, সোমবারের বিধানসভা মার্চ এবং জলকামানের মুখেও তাঁদের এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা সেই বার্তাই স্পষ্ট করেছে।



