জামাই ষষ্ঠী উৎসবের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এক প্রাচীন ব্রতকথা, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বাংলার ঘরে ঘরে প্রচলিত। আজকের দিনে জামাই আপ্যায়নই এই উৎসবের প্রধান আকর্ষণ হলেও, এর মূল ভিত্তি আসলে ষষ্ঠী দেবীর আরাধনা। ‘জামাই ষষ্ঠীর ব্রতকথা’ জানলে বোঝা যায় কেন এই দিনটি সন্তান, পরিবার এবং শুভকামনার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, ষষ্ঠী দেবী হলেন সন্তানদের রক্ষাকর্ত্রী দেবী। তাঁর আশীর্বাদে সন্তানের মঙ্গল, পরিবারের সুখ-সমৃদ্ধি এবং দীর্ঘায়ু লাভ হয় বলে মনে করা হয়। সেই বিশ্বাস থেকেই জ্যৈষ্ঠ মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠী তিথিতে পালিত হয় জামাই ষষ্ঠী।
জামাই ষষ্ঠীর ব্রতকথা কী?
প্রচলিত কাহিনি অনুসারে, এক গ্রামে এক লোভী গৃহবধূ বাস করতেন। তিনি প্রায়ই পরিবারের জন্য রান্না করা ভালো খাবার চুরি করে খেয়ে ফেলতেন। কিন্তু নিজের দোষ স্বীকার না করে তিনি সব সময় সেই দোষ চাপাতেন একটি কালো বিড়ালের উপর।
এই কালো বিড়ালটি ছিল ষষ্ঠী দেবীর বাহন। বারবার মিথ্যা অপবাদে বিড়ালটি কষ্ট পেয়ে ষষ্ঠী দেবীর কাছে অভিযোগ জানায়।
ষষ্ঠী দেবীর অভিশাপ
বিড়ালের কথা শুনে ষষ্ঠী দেবী ওই নারীর আচরণে অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হন। লোককথা অনুযায়ী, দেবী একে একে তাঁর সন্তানদের নিজের কাছে নিয়ে যান।
সন্তানদের হারিয়ে ওই নারী গভীর শোকে ভেঙে পড়েন। তিনি বুঝতে পারেন, নিজের লোভ এবং মিথ্যা কথার জন্যই এই বিপদ নেমে এসেছে।

ভুল বুঝতে পেরে ক্ষমা প্রার্থনা
অনেক খোঁজাখুঁজির পর ওই নারী জানতে পারেন যে ষষ্ঠী দেবী তাঁর উপর রুষ্ট হয়েছেন। এরপর তিনি আন্তরিকভাবে নিজের ভুল স্বীকার করেন এবং দেবীর কাছে ক্ষমা চান।
ষষ্ঠী দেবী তাঁর অনুতাপে সন্তুষ্ট হন। তিনি সন্তানদের ফিরিয়ে দেন এবং আশীর্বাদ করেন যাতে ভবিষ্যতে পরিবারে সুখ ও শান্তি বজায় থাকে।
ব্রতকথার মূল শিক্ষা কী?
জামাই ষষ্ঠীর ব্রতকথা শুধুমাত্র ধর্মীয় কাহিনি নয়, এর মধ্যে সামাজিক ও নৈতিক শিক্ষাও রয়েছে।
এই কাহিনি মানুষকে শেখায়—
- মিথ্যা কথা বলা উচিত নয়
- অন্যের উপর দোষ চাপানো অন্যায়
- লোভের পরিণতি খারাপ হতে পারে
- নিজের ভুল স্বীকার করার গুরুত্ব রয়েছে
- পরিবার ও সন্তানের মঙ্গল সর্বাগ্রে
জামাই ষষ্ঠীর সঙ্গে এই কাহিনির সম্পর্ক কী?
প্রথমদিকে ষষ্ঠী দেবীর ব্রত মূলত সন্তানদের মঙ্গল কামনার জন্য পালন করা হত। পরে বাংলার সামাজিক প্রথার সঙ্গে এই ব্রত মিশে যায়।
বিবাহিত মেয়েকে বাপের বাড়িতে নিমন্ত্রণ করা এবং জামাইকে আপ্যায়ন করার রীতি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। সময়ের সঙ্গে এই পারিবারিক অনুষ্ঠানই ‘জামাই ষষ্ঠী’ নামে পরিচিতি পায়।
ষষ্ঠী দেবী কে?
হিন্দু ধর্মে ষষ্ঠী দেবীকে মাতৃত্ব, সন্তান জন্ম এবং শিশুদের রক্ষাকর্ত্রী দেবী হিসেবে মানা হয়।
বাংলার বহু অঞ্চলে এখনও সন্তানের মঙ্গল কামনায় ষষ্ঠী পুজো করা হয়। বিশেষ করে নবজাতক শিশুদের পরিবারে ষষ্ঠী দেবীর আরাধনার প্রচলন রয়েছে।
জামাই ষষ্ঠীর দিনে কীভাবে ব্রত পালন করা হয়?
এই দিনে সাধারণত শাশুড়িরা ষষ্ঠী দেবীর পুজো করেন এবং পরিবারের সদস্যদের মঙ্গল কামনা করেন।
পুজোর পর জামাইকে আশীর্বাদ করা হয়, নতুন পোশাক দেওয়া হয় এবং বিশেষ ভোজের আয়োজন করা হয়। এই রীতির মধ্যেই ধর্মীয় বিশ্বাস ও পারিবারিক ঐতিহ্যের মিলন ঘটে।
জামাই ষষ্ঠীর ব্রতকথা শুধুমাত্র একটি লোককাহিনি নয়, বরং বাংলার সংস্কৃতি, পারিবারিক মূল্যবোধ এবং ধর্মীয় বিশ্বাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই আজও এই কাহিনি বাঙালির ঘরে ঘরে সমানভাবে সমাদৃত এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলেছে।
সম্পর্কিত প্রতিবেদন



