জামাই ষষ্ঠীর ইতিহাস: কেন পালন করা হয় এই বাঙালি উৎসব? জানুন অজানা কাহিনি

জামাই ষষ্ঠীর ইতিহাস কী? কেন পালন করা হয় এই জনপ্রিয় বাঙালি উৎসব, কীভাবে শুরু হয়েছিল প্রথা এবং ষষ্ঠী দেবীর সঙ্গে এর সম্পর্ক জানুন।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

জামাই ষষ্ঠী মানেই বাঙালি পরিবারের উৎসব, ভুরিভোজ আর জামাই আপ্যায়ন। কিন্তু এই জনপ্রিয় উৎসবের শুরু কীভাবে? কেনই বা বছরের একটি দিন বিশেষভাবে জামাইদের জন্য উৎসর্গ করা হয়? ‘জামাই ষষ্ঠীর ইতিহাস’ নিয়ে কৌতূহল বহু মানুষের। বাস্তবে এই উৎসবের শিকড় রয়েছে ষষ্ঠী দেবীর আরাধনা, পারিবারিক সম্পর্ক এবং বাংলার সামাজিক ঐতিহ্যের সঙ্গে।

বর্তমানে জামাই ষষ্ঠী মূলত শাশুড়ি ও জামাইয়ের সম্পর্কের উৎসব হিসেবে পরিচিত হলেও ইতিহাস বলছে, এর মূল উদ্দেশ্য ছিল সন্তান ও পরিবারের মঙ্গল কামনা। সময়ের সঙ্গে সেই ধর্মীয় আচারই রূপ নিয়েছে বাঙালির অন্যতম জনপ্রিয় সামাজিক উৎসবে।

জামাই ষষ্ঠীর ইতিহাস কী?

ইতিহাসবিদদের মতে, জামাই ষষ্ঠীর মূল উৎস হল ষষ্ঠী দেবীর পুজো। হিন্দু ধর্মে ষষ্ঠী দেবীকে সন্তান রক্ষা, মাতৃত্ব এবং উর্বরতার দেবী হিসেবে মানা হয়। বাংলায় বহু শতাব্দী ধরে জ্যৈষ্ঠ মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠী তিথিতে ষষ্ঠী দেবীর আরাধনা করা হয়ে আসছে।

ধীরে ধীরে এই ধর্মীয় আচার পারিবারিক রীতির সঙ্গে মিশে যায়। বিবাহিত কন্যা এবং তাঁর স্বামীকে বাপের বাড়িতে নিমন্ত্রণ করার প্রথা তৈরি হয়। সেই থেকেই ‘জামাই ষষ্ঠী’ উৎসবের জনপ্রিয়তা বাড়তে শুরু করে।

লোককথায় জামাই ষষ্ঠীর উৎপত্তি

জামাই ষষ্ঠীকে ঘিরে বাংলায় একটি জনপ্রিয় ব্রতকথা প্রচলিত রয়েছে।

কথিত আছে, এক গৃহবধূ বাড়ির খাবার চুরি করে খেতেন এবং সেই দোষ চাপাতেন একটি কালো বিড়ালের উপর। সেই বিড়াল ছিল ষষ্ঠী দেবীর বাহন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে দেবী ওই নারীর সন্তানদের কেড়ে নেন। পরে নিজের ভুল বুঝতে পেরে ওই নারী দেবীর কাছে ক্ষমা চান। দেবী সন্তুষ্ট হয়ে তাঁর সন্তানদের ফিরিয়ে দেন। এই কাহিনি থেকেই ষষ্ঠী দেবীর ব্রত ও পারিবারিক মঙ্গলকামনার প্রথা জনপ্রিয় হয় বলে লোকবিশ্বাস রয়েছে।

জামাই ষষ্ঠীর ইতিহাস: কেন পালন করা হয় এই বাঙালি উৎসব? জানুন অজানা কাহিনি
জামাই ষষ্ঠীর ইতিহাস: কেন পালন করা হয় এই বাঙালি উৎসব? জানুন অজানা কাহিনি

কেন জামাইকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়?

একসময় বাংলার সমাজে মেয়েদের বিয়ে অনেক দূরে দেওয়া হত। যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত না থাকায় মেয়ের বাবা-মায়ের পক্ষে নিয়মিত মেয়ের সঙ্গে দেখা করা কঠিন ছিল।

ফলে নির্দিষ্ট দিনে মেয়ে ও জামাইকে বাপের বাড়িতে আমন্ত্রণ জানানো একটি সামাজিক প্রথায় পরিণত হয়। এর মাধ্যমে পরিবারগুলির মধ্যে সম্পর্ক বজায় থাকত এবং আত্মীয়তার বন্ধন আরও দৃঢ় হত। গবেষকরা মনে করেন, এই সামাজিক প্রেক্ষাপটও জামাই ষষ্ঠীর জনপ্রিয়তার একটি বড় কারণ।

জামাই ষষ্ঠীতে কী কী রীতি পালন করা হয়?

এই দিনে সাধারণত শাশুড়ি ষষ্ঠী দেবীর পুজো করেন এবং জামাইয়ের দীর্ঘায়ু, সুস্বাস্থ্য ও সমৃদ্ধি কামনা করেন।

এরপর জামাইকে নতুন পোশাক, ফল, মিষ্টি এবং বিভিন্ন উপহার দেওয়া হয়। বিশেষ ভোজের আয়োজনও থাকে। বাঙালি পরিবারের ঐতিহ্য অনুযায়ী ইলিশ, চিংড়ি, কাতলা, মাংস, পোলাও, দই ও মিষ্টি দিয়ে আপ্যায়ন করা হয়।

আধুনিক বাংলায় জামাই ষষ্ঠী

বর্তমান সময়ে জামাই ষষ্ঠী শুধুমাত্র ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং পারিবারিক মিলনমেলার দিন হিসেবেও পরিচিত। শহর থেকে গ্রাম, এমনকি বিদেশে বসবাসকারী বাঙালিদের মধ্যেও এই উৎসব সমান জনপ্রিয়।

রেস্তোরাঁ, মিষ্টির দোকান এবং হোটেলগুলিও এই উপলক্ষে বিশেষ আয়োজন করে থাকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুভেচ্ছা বিনিময়ও এখন উৎসবের অংশ হয়ে উঠেছে।

জামাই ষষ্ঠী কি শুধুই জামাইদের উৎসব?

মজার বিষয় হল, অনেক গবেষক মনে করেন জামাই ষষ্ঠীর মূল কেন্দ্রবিন্দু আসলে জামাই নন, বরং ষষ্ঠী দেবীর আরাধনা এবং পরিবারের মঙ্গল কামনা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জামাই আপ্যায়নের অংশটি এতটাই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে যে উৎসবটি ‘জামাই ষষ্ঠী’ নামে পরিচিতি পায়।

বাংলার পারিবারিক সংস্কৃতি, ষষ্ঠী দেবীর ব্রত এবং আত্মীয়তার বন্ধনের এক অনন্য মেলবন্ধন হল জামাই ষষ্ঠী। তাই এই উৎসব শুধু ভোজ বা আপ্যায়নের দিন নয়, বরং বাঙালির সামাজিক ঐতিহ্য ও পারিবারিক মূল্যবোধেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক।

সম্পর্কিত প্রতিবেদন

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

বিজ্ঞাপন

আরও খবর