আরজি করের মহিলা চিকিৎসককে ধর্ষণ এবং খুনের ঘটনা শোরগোল ফেলে দিয়েছে গোটা রাজ্যে। আর মাত্র পাঁচ দিন পর পূর্ণ হবে ঘটনার একমাস। বুধবার সুপ্রিম কোর্টে তদন্তের স্টেটাস রিপোর্ট জমা দেবে সিবিআই। কিন্তু কেন চেস্ট মেডিসিন বিভাগের এই চিকিৎসককে খুন করা হল তা নিয়ে রয়েছে অনেক প্রশ্ন! এখনও সমস্ত রহস্যের কিনারা করা সম্ভব হয়নি। পুলিশের সিজার লিস্ট দেখার পর আরও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসছে। এমনকি মনে করা হচ্ছে যে, সেমিনার হলে এই দেহ উদ্ধার হয়েছিল সেই ঘর কি আগে থেকে সাজানো হয়েছিল? ঘটনা কি অন্য কোথাও ঘটেছিল? তারপর তরুণী চিকিৎসকের ওই দেহ সেমিনার হলে নিয়ে এসে রাখা হয়? ঠিক কোন উদ্দেশ্যে এবং কেন? এটাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
পুলিশের সিজার লিস্টে বলা হয়েছে, নীল রঙের একটা ম্যাট্রেসের উপর নির্যাতিতার দেহ শায়িত ছিল। পাশে ছিল একটি টেবিল সেই টেবিলের উপর রাখা ছিল নির্যাতিতার ব্যাগ। পাশে দু’টি চেয়ার ছিল। একটি চেয়ারে রাখা ছিল নীল রঙের একটি ব্যাগ এবং অন্য চেয়ারটিতে ছিল ‘কেস প্রেসেন্টেশন খাতা’ লেখা একটি খাতা। পুলিশের তরফে দাবি করা হয়, যে ব্লুটুথ হেডফোনের ওপর ভিত্তি করে সিভিক ভলান্টিয়ার সঞ্জয় রায়কে গ্রেপ্তার করা হয়েছে সেই এয়ারফোন নাকি ছিল ম্যাট্রেসের নিচে।
অনেকের প্রশ্ন, ধস্তাধস্তিতে ম্যাট্রেসের নিচে এয়ারফোন ঢুকে গেল অথচ ম্যাট্রিসের চাদরে কেন সেরকম ধস্তাধস্তির চিহ্ন নেই? আন্দোলনকারী চিকিৎসকদের ও দাবি মৃতদেহ সেমিনার রুমে পড়ে থাকার যে ছবি ইতিমধ্যেই সমাজেরমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে সেখানে ম্যাট্রেসের চাদর গোঁজা অবস্থাতেই দেখা গিয়েছে। তাহলে এয়ারফোন কি করে চাদরের নিচে চলে গেল? নির্যাতিতার বাবা তো স্পষ্ট প্রশ্ন তুলেছেন, “তবে কি সব ঘটনাই সাজানো?”
প্রসঙ্গত, এই ঘটনার পর টালা থানায় ৮৬১ নম্বর অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলার ভিত্তিতে একটি সিজার লিস্ট তৈরি করা হয়েছে। তালিকায় রয়েছে মোট ৪০টি জিনিস। নির্যাতিতার যে ব্যাগটি পাওয়া গিয়েছিল তার ভেতরে একটি ডায়েরি, কিছু কাগজপত্র, কয়েকজন রোগীর নথি ও রোগীর পেশেন্ট কার্ড ইত্যাদি পাওয়া গিয়েছে।
এছাড়াও ঘটনাস্থল থেকে যে সমস্ত জিনিস পাওয়া গিয়েছে সেগুলো হল, কালো রঙের একটি চশমার ফ্রেম, চশমার ভাঙা ফাইবার গ্লাস, লেখার খাতা, স্পাইরাল বাইন্ডিং করা আলাদা একটি খাতা, সবুজ রঙের কলম, একটি নীল রঙের জিন্স, একটি অন্তর্বাস, কালো চুলের অংশ সাদা এবং ধূসর রঙের চুলের ক্লেচার, নীল এবং কালো রঙের একটি লুমা কোম্পানির এয়ারফোন, কালো রঙের মাউস, মাউথ গার্ড, সার্জিকাল মাস্ক, ভিভো কোম্পানির একটি নীল রঙের মোবাইল ফোন, পাওয়ার ব্যাংক, চার্জার।
সঙ্গে আরও পাওয়া গিয়েছে, দু’টো লাল রঙের কম্বল, একটি কালো রঙের ল্যাপটপ, হাসপাতালের স্ট্যাম্প মারা একটি নীল রঙের চাদর, ম্যাট্রেসের ছেঁড়া অংশ, ম্যাট্রেস থেকে পাওয়া সিনথেটিক কটন, সবুজ রঙের ফাইবার জলের বোতল, ধূসর এবং কমলা রঙের এক জোড়া জুতো, দু’টো টিফিন বক্স, টেথিস্কোপ, কালো এবং হলুদ রঙের একটি অক্সিমিটার, ছাতা, চিকিৎসা সংক্রান্ত বই, নির্যাতিতার প্যান কার্ড, নির্যাতিতার ডেবিট কার্ড, নির্যাতিতার আরজি করের পরিচয়পত্র, কয়েকটি ওষুধ, নির্যাতিতার নাম লেখা ভিজিটিং কার্ড এবং দু’টি ব্যাগ মিলিয়ে আরও কিছু কাগজপত্র, ‘কেস প্রেসেন্টেশন খাতা’-য় রয়েছে বিভিন্ন ডাক্তারদের নাম এবং কিছু রোগের বিবরণী।
এই সিজার লিস্টে সাক্ষী হিসেবে সই করেছেন দু’জন চিকিৎসক, একজন পুলিশকর্মী (যিনি এই তালিকা প্রস্তুত করেছেন)। এখানে আরও একটি প্রশ্ন আছে, সন্ধ্যে সাড়ে আটটায় মৃতদেহ শেষকৃত্যের জন্য শ্মশানে পৌঁছেছিল। তাহলে ওই সময় সিজার তালিকা কেন তৈরি হল? সিজার তালিকা তো এফআইআর-এর আগে তৈরি করা হয়েছে? কেন এই তৎপরতা?
অনেকে আবার এই প্রশ্ন তুলছেন, ময়নাতদন্ত রিপোর্ট বলছে নাক-মুখ এবং গলা একসঙ্গে চেপে ধরে শ্বাসরোধ করে নির্যাতিতাকে খুন করা হয়। ফলে যদি ধরে নেওয়া হয় একজনই গলার টিপেছে এবং নাক মুখ চেপে ধরে শ্বাসরোধ করেছে। তাহলে সে নির্যাতিতার হাত-পা ধরবে কি করে? আর হাত-পা মুক্ত থাকলে প্রতিরোধের বদলে কি কেউ ম্যাট্রেস ছিঁড়বেন? যে দু’টি ব্যাগ পাওয়া গিয়েছে সে দুটি ব্যাগ কি আদৌ নির্যাতিতার? তাও কিন্তু পুলিশের তরফে সরাসরি কিছু জানানো হয়নি।
এতদিন এই ঘটনায় একটি লাল রঙের কম্বল নিয়ে মৃতা ঘুমোচ্ছিলেন বলে পুলিশ দাবি করে আসছিল কিন্তু পরবর্তী ক্ষেত্রে সেই চাদরের রং বদলে গিয়ে হয় নীল! অথচ সিজার তালিকায় এখনও বলা হচ্ছে সিজার লিস্টেও ওই নীল চাদরের কথা উল্লেখ নেই। নীল রঙের অন্য যে চাদরটির কথা উল্লেখ আছে সেটা আরজি করে স্ট্যাম্প মারা একটি চাদর। অর্থাৎ প্রশ্ন অনেক, উত্তর এখনও অজানা।



