পশ্চিম এশিয়ায় ইরান বনাম আমেরিকা–ইজ়রায়েল সংঘাত যত তীব্র হচ্ছে, ততই বাড়ছে ভারতের দুশ্চিন্তা। বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম লাফিয়ে উঠছে, শেয়ার বাজারে অস্থিরতা—রান্নার গ্যাস থেকে পেট্রল-ডিজ়েল, নিত্যপণ্যের দামে ‘সিঁদুরে মেঘ’ দেখছে নয়াদিল্লি। কেন্দ্রের শীর্ষস্তরে শুরু হয়েছে প্রভাবের চুলচেরা বিশ্লেষণ।
কেন বাড়ছে তেলের দাম?
পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলিই বিশ্বের সিংহভাগ তেল রফতানি করে। যুদ্ধের জেরে উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যাহত হলে দাম বাড়বেই। ব্লুমবার্গ-সহ আন্তর্জাতিক রিপোর্টে আশঙ্কা, পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ২০% পর্যন্ত বাড়তে পারে ব্রেন্ট ক্রুডের দর। ইতিমধ্যেই ব্যারেলপ্রতি দাম ৮০ ডলারের উপরে।
ভারত তার প্রয়োজনীয় তেলের প্রায় ৮২% আমদানি করে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল ১ ডলার দাম বাড়লেই বছরে অতিরিক্ত প্রায় ২০০ কোটি ডলারের বোঝা পড়তে পারে।
হরমুজ় প্রণালী: বড় ঝুঁকি
বিশ্ব তেল সরবরাহের প্রায় ২০% যায় Strait of Hormuz দিয়ে। চলতি বছরের শুরুতে ভারতের আমদানি করা ক্রুডের প্রায় অর্ধেকই এসেছে এই পথ ধরে। ইরান যদি প্রণালীতে নিয়ন্ত্রণ কড়া করে, বা ট্যাঙ্কার চলাচল ব্যাহত হয়, সরবরাহে ধাক্কা লাগবেই।
রান্নার গ্যাসে বেশি চাপ
পেট্রোল-ডিজ়েলের পাশাপাশি এলপিজি-র দামও বাড়তে পারে। কারণ তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের বড় অংশও আসে পশ্চিম এশিয়া থেকে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ হলে প্রথম অভিঘাত পড়বে আমজনতার হেঁশেলে।
মুদ্রাস্ফীতি ও সুদের হার
খুচরো মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল Reserve Bank of India। কিন্তু তেলের দাম চড়লে মুদ্রাস্ফীতি বাড়বে। সে ক্ষেত্রে সুদের হার কমানো কঠিন হবে। ভাসমান সুদে বাড়ি বা গাড়ির ঋণে স্বস্তি মিলবে না। টাকার মানও ডলারের তুলনায় চাপে পড়তে পারে।
বিকল্পের খোঁজে দিল্লি
রুশ ‘উরাল’ ক্রুড বা ভেনেজ়ুয়েলার তেলের দিকে ঝুঁকতে পারে ভারত—এমন জল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি উপসাগরীয় আকাশসীমা ও সমুদ্রপথ অচল হলে বিকল্প রুট হিসেবে লোহিত সাগর বা এডেন উপসাগরের দিকেও নজর।
কৌশলগত বিনিয়োগে ঝুঁকি
ইরানের চাবাহার বন্দর কিংবা ইজ়রায়েলের হাইফা বন্দরে ভারতের বিনিয়োগ রয়েছে। সংঘাত ছড়ালে সেই প্রকল্পগুলিও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
সরকারের পদক্ষেপ
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে নিরাপত্তা বিষয়ক বৈঠক হয়েছে। জ্বালানি মজুত আপাতত ৭৪ দিনের মতো রয়েছে বলে পেট্রোলিয়াম মন্ত্রক সূত্রে জানা গিয়েছে। নৌবাহিনী মোতায়েন, নাগরিক উদ্ধার এবং কূটনৈতিক ভারসাম্য—সব দিকেই নজর রাখছে কেন্দ্র।
যুদ্ধ কত দিন চলবে, তা অনিশ্চিত। তবে স্পষ্ট—সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়বে ভারতের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের পকেটে। এখন চোখ আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও জ্বালানি বাজারের গতিপথে।



