দীর্ঘ আলোচনার পর অবশেষে ভারত-আমেরিকা বাণিজ্য চুক্তি (India-US Trade Deal) নিয়ে আশার আলো দেখা যাচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়া সফরে গিয়ে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump) ঘোষণা করেছেন, “ভারতের সঙ্গে আমরা খুব শীঘ্রই একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য চুক্তি করতে চলেছি।” এই মন্তব্যের পর আন্তর্জাতিক মহলে জল্পনা শুরু হয়েছে — ট্যারিফ কি এবার সত্যিই কমবে?
ট্রাম্প বুধবার দক্ষিণ কোরিয়ায় Asia Pacific Economic Cooperation (APEC) সামিটে যোগ দিতে গিয়ে বলেন, “আমার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর (Narendra Modi) প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা রয়েছে। আমাদের সম্পর্ক দারুণ। আমরা একসঙ্গে এমন একটি চুক্তি করছি, যা দুই দেশের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করবে।”


যদিও চুক্তির চূড়ান্ত দিনক্ষণ বা খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে ট্রাম্প বিস্তারিত কিছু জানাননি, তবে কূটনৈতিক মহল মনে করছে দুই দেশই এখন সমঝোতার একেবারে শেষ ধাপে পৌঁছেছে।
ভারত-আমেরিকা বাণিজ্য সম্পর্কের প্রেক্ষাপট:
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় ফেরার পরই দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তির আলোচনা শুরু হয়। কিন্তু নানা মতভেদের কারণে সেটি আটকে যায়। বিশেষত ভারতের কৃষি ও দুগ্ধ খাত (agriculture and dairy sector) আমেরিকার জন্য উন্মুক্ত করতে রাজি হয়নি নয়াদিল্লি। কেন্দ্রের যুক্তি, এই খাত দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবিকার উৎস।
এই অচলাবস্থা কাটাতে সেপ্টেম্বরে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়। বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল (Piyush Goyal)-এর নেতৃত্বে ভারতের প্রতিনিধি দল ওয়াশিংটনে মার্কিন বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বৈঠকে বসে। বৈঠকের পর গোয়েল জানান, “দুই দেশের মধ্যে গঠনমূলক আলোচনা হয়েছে এবং ইতিবাচক সাড়া মিলেছে।”


এই সময়েই আমেরিকা ভারতের পণ্যে প্রায় ৫০ শতাংশ ট্যারিফ (tariff) চাপায়, যা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। ট্রাম্পের দাবি ছিল, রাশিয়া থেকে তেল কেনার কারণে এই সিদ্ধান্ত। তবে ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর (S. Jaishankar)-এর মতে, প্রকৃত কারণ ছিল বাণিজ্য চুক্তির বিলম্ব।
ট্রাম্প-মোদী সম্পর্কের নতুন অধ্যায়:
ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্যে স্পষ্ট, ওয়াশিংটন নয়াদিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক আরও দৃঢ় করতে চাইছে। তিনি মোদীর প্রতি তাঁর “ব্যক্তিগত শ্রদ্ধা”র কথা উল্লেখ করে বলেন, “ভারত একটি শক্তিশালী বাণিজ্য অংশীদার। আমরা একসঙ্গে ইতিহাস তৈরি করতে চলেছি।”
ভারতীয় কূটনৈতিক সূত্রে খবর, রাশিয়া থেকে তেল আমদানির পরিমাণ ধীরে ধীরে কমাবে ভারত। ট্রাম্পের দাবি, এই বিষয়ে মোদী তাঁকে আশ্বস্ত করেছেন। যদিও নয়াদিল্লি আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু বলেনি, তবে এর পর থেকেই দুই দেশের মধ্যে ইতিবাচক বার্তা আদানপ্রদান বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই চুক্তি হলে ভারতীয় পণ্যের উপর আমেরিকার ট্যারিফ ৫০ শতাংশ থেকে ১৫-১৬ শতাংশে নেমে আসতে পারে, যা ভারতের জন্য বড় আর্থিক স্বস্তি। একই সঙ্গে আমেরিকার বাজারে ভারতের কৃষিপণ্য, বস্ত্র, এবং ফার্মাসিউটিক্যালস খাত নতুন গতি পাবে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ:
এই চুক্তি কেবল অর্থনৈতিক দিক থেকেই নয়, রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও তাৎপর্যপূর্ণ। চীনকে টেক্কা দিতে ভারত-আমেরিকা ঘনিষ্ঠতা নতুন কৌশলগত ভারসাম্য তৈরি করতে পারে। ট্রাম্পের মন্তব্যকে তাই শুধু বাণিজ্যিক বার্তা নয়, বরং বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক সংকেত হিসেবেই দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
এখন নজর রয়েছে কবে এই India-US Trade Deal আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়। তবে একথা স্পষ্ট — দুই দেশই নতুন যুগের অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের দিকে এগোচ্ছে।









