নজরবন্দি ব্যুরো: চিনির বাজারে লাগামছাড়া দামের জেরে বড় সিদ্ধান্ত নিল কেন্দ্র। প্রায় এক দশক পর ফের বিদেশ থেকে চিনি কিনতে চলেছে ভারত। চিনির দাম বৃদ্ধি (Sugar Price Hike) নিয়ন্ত্রণে আনতে ১০ লক্ষ মেট্রিক টন কাঁচা চিনি শুল্কমুক্ত আমদানির অনুমতি দিয়েছে সরকার। ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত এই আমদানি করা যাবে।
একসময় চিনি উৎপাদনে উদ্বৃত্ত থাকা ভারত নিয়মিত আন্তর্জাতিক বাজারে চিনি রফতানি করত। কিন্তু চলতি মরশুমে পরিস্থিতি দ্রুত বদলেছে। একদিকে অনিয়মিত ও ঘাটতি বৃষ্টির প্রভাব, অন্যদিকে ইথানল উৎপাদনের জন্য আখের ব্যবহার—দুইয়ের ধাক্কায় দেশের বাজারে চিনির সরবরাহ নিয়ে চাপ তৈরি হয়েছে।
সরকারের এই সিদ্ধান্তের মূল লক্ষ্য উৎসবের মরশুমের আগে বাজারে পর্যাপ্ত চিনি পৌঁছে দেওয়া। আগস্ট থেকে নভেম্বর পর্যন্ত দেশে গণেশ চতুর্থী, দশেরা ও দীপাবলির মতো উৎসব ঘিরে চিনির চাহিদা বাড়ে। সামনে চাহিদা আরও বাড়ার আশঙ্কাতেই সরবরাহের ঘাটতি তৈরি হওয়ার আগেই বাজারে অতিরিক্ত চিনি ঢোকাতে চাইছে কেন্দ্র।
ইতিমধ্যেই দেশের বাজারে চিনির দাম দ্রুত বেড়েছে। রয়টার্সের সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, মাত্র দুই মাসে চিনির দাম প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। এর আগে অগাস্টের শুরুতেই এক মাসে সর্বভারতীয় গড় দাম প্রায় ১৭ শতাংশ বেড়ে প্রতি কুইন্টালে ৪,৬২০ টাকায় পৌঁছেছিল।
মহারাষ্ট্রের কোলহাপুর, দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চিনি বাজার, এই মূল্যবৃদ্ধির সবচেয়ে বড় উদাহরণ। সেখানে পাইকারি বাজারে চিনির দর রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। ১৮ আগস্টের রিপোর্টে কোলহাপুরে প্রতি ১০০ কেজি চিনির দাম প্রায় ৫,৩৫০ টাকায় ওঠার কথা জানিয়েছিল রয়টার্স।
চিনির দাম বাড়ার পেছনে আবহাওয়ার ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। মহারাষ্ট্র ও কর্নাটকের মতো গুরুত্বপূর্ণ আখ উৎপাদনকারী রাজ্যে বৃষ্টির ঘাটতি উৎপাদন নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। আখের মতো জলনির্ভর ফসলের ক্ষেত্রে বর্ষার ঘাটতি সরাসরি উৎপাদন কমার আশঙ্কা তৈরি করে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইথানল উৎপাদনের বিষয়টি। পেট্রোলে ২০ শতাংশ ইথানল মেশানোর লক্ষ্যে গত কয়েক বছরে কেন্দ্র আখ-ভিত্তিক ইথানল উৎপাদনে জোর দিয়েছে। রয়টার্সের রিপোর্ট অনুযায়ী, চলতি বছরে প্রায় ৩০ লক্ষ মেট্রিক টন চিনি ইথানল তৈরির দিকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে বাজারে চিনি সরবরাহের পরিমাণ আরও চাপে পড়েছে।
এখন পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে সরকার আগামী মরশুমে আখ থেকে ইথানল উৎপাদনের নীতিতেও কিছুটা পরিবর্তনের কথা ভাবছে। বেশি চিনি বাজারে রাখার জন্য আখের রস বা B-heavy molasses-এর বদলে চিনি উৎপাদনের পর অবশিষ্ট C-heavy molasses থেকে ইথানল তৈরিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার মতো বিকল্প নিয়েও আলোচনা চলছে।
তবে শুধু আমদানি করলেই যে চিনির দাম এক ধাক্কায় অনেকটা কমে যাবে, এমনটা মনে করছে না বাজার। সরকারের লক্ষ্য মূলত সরবরাহ বাড়িয়ে উৎসবের আগে বাজারের চাপ কমানো। একই কারণে বড় ক্রেতা ও মজুতদারদের ক্ষেত্রেও স্টক রাখার সীমা আরও কঠোর করা হয়েছে। সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর পর্যন্ত মাসে ১০ টনের বেশি চিনি ব্যবহারকারী bulk consumers-দের ১৫ দিনের প্রয়োজনের বেশি মজুত না রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ভারতের এই সিদ্ধান্তের প্রভাব শুধু দেশের বাজারেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। ভারত বিশ্বের বৃহত্তম চিনি-ভোক্তা দেশগুলির অন্যতম এবং সাধারণ বছরে আন্তর্জাতিক বাজারে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ চিনি সরবরাহ করে। সেই ভারতই এবার আমদানিকারক হওয়ায় লন্ডন ও নিউ ইয়র্কের আন্তর্জাতিক চিনি বাজারেও দামের উপর নতুন চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
চিনির দাম বাড়লে তার প্রভাব সরাসরি পড়ে মিষ্টি, বেকারি, পানীয়, বিস্কুট ও নানা প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের উপর। বিশেষ করে দুর্গাপুজো থেকে দীপাবলি পর্যন্ত উৎসবের সময়ে মিষ্টি ও অন্যান্য মিষ্টিজাত খাবারের চাহিদা বাড়ায় ব্যবসায়ীদের খরচও বাড়তে পারে।
অর্থাৎ, একদিকে দেশের জ্বালানি নীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে ইথানল উৎপাদন বাড়ানোর প্রয়োজন, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের জন্য চিনির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার চাপ—দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করাই এখন কেন্দ্রের বড় চ্যালেঞ্জ। ১০ লক্ষ টন শুল্কমুক্ত আমদানির সিদ্ধান্তে আপাতত বাজারে কিছুটা স্বস্তি আসে কি না, সেটাই এখন নজরে।



