ভারত ও রাশিয়ার কৌশলগত সম্পর্ক আরও ঘনীভূত হতে চলেছে। প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের দিল্লি সফরের আগে দুই দেশের মধ্যে যে নয়া সামরিক চুক্তি অনুমোদিত হয়েছে, তা দ্বিপাক্ষিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকে নতুন দিশা দেবে। এই India-Russia military agreement ভারতীয় প্রতিরক্ষা বৃত্তে বড় বার্তা বহন করছে। আন্তর্জাতিক মহলে জোর জল্পনা—যদি কোনও যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হয়, তবে রুশ নৌবহরসহ সামরিক বাহিনী ভারতের পাশে দাঁড়াতে পারে।
রাশিয়ার স্টেট দুমা সদ্য সবুজ সংকেত দিয়েছে RELOS (Reciprocal Exchange of Logistic Support) Agreement–কে। এই চুক্তি দুই দেশের সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীকে পারস্পরিক ভাবে একে অপরের ঘাঁটি, জ্বালানি, মেরামত ব্যবস্থা ও লজিস্টিক অবকাঠামো ব্যবহার করার অনুমতি দেবে। অর্থাৎ, ভারতীয় যুদ্ধজাহাজ বা সামরিক বিমান প্রয়োজন হলে রুশ বন্দর ও ঘাঁটি ব্যবহার করতে পারবে এবং একইভাবে রুশ নৌবহরও প্রয়োজনে ভারতের নৌঘাঁটিতে প্রবেশাধিকার পাবে।
যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ভারতের পাশে থাকবে রুশ নৌবহর, প্রকাশ্যে এল নয়া সামরিক চুক্তি
ভারত-রাশিয়া নয়া সামরিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল চলতি বছরের ১৮ ফেব্রুয়ারি। এরপর রুশ প্রধানমন্ত্রী মিখাইল মিশুস্তিন এটি অনুমোদনের জন্য পাঠান স্টেট দুমায়। অবশেষে মঙ্গলবার সেই চুক্তি আনুষ্ঠানিক অনুমোদন পেল। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অনুমোদন পুতিনের ভারত সফরকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে এবং দুই দেশের বোঝাপড়া আরও দৃঢ় হচ্ছে।
দুমার স্পিকার ভিয়াচেস্লাভ ভোলোদিন বলেন, ভারতের সঙ্গে রাশিয়ার গভীর কৌশলগত সম্পর্ক বহু দশকের পুরোনো। এই সম্পর্ক রাজনৈতিক, সামরিক ও ভূরাজনৈতিক স্তরে সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে, RELOS চুক্তি শুধু লজিস্টিক ব্যবস্থাপনা নয়—এটি দুই দেশের ডিফেন্স স্ট্র্যাটেজি আরও শক্তিশালী করবে।
এই নয়া সামরিক চুক্তিকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক মহলে বেশ কিছু বিশ্লেষণ সামনে আসছে। অনেকেই মনে করছেন, ভারত-চীন সীমান্ত উত্তেজনা, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল নিয়ে ভূরাজনৈতিক টানাপড়েন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের Indo-Pacific Strategy—সব মিলিয়ে ভারত তার কৌশলগত স্বাধীনতা ধরে রাখতে চায়। তাই রাশিয়ার সঙ্গে India-Russia Military Agreement দিল্লির স্ট্র্যাটেজিক ব্যালান্স আরও সুসংহত করবে।
রাশিয়াও এই সহযোগিতাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিচ্ছে। ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষিতে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা বাড়ায় মস্কো এশিয়া বাজারে বিশেষ করে ভারতের সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও জ্বালানি সম্পর্ক আরও গভীর করতে চাইছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই নয়া সামরিক চুক্তি রাশিয়ার সেই বৃহত্তর কূটনৈতিক পরিকল্পনারই অংশ।
ভারতের পক্ষ থেকেও RELOS-কে বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ, এই চুক্তির ফলে ভারত মহাসাগর, আরব সাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে রুশ নৌবাহিনীর উপস্থিতি ভারতকে কৌশলগত সুবিধা দেবে। অপরদিকে রাশিয়া পাবে ভারতীয় মহাসাগরীয় অঞ্চলে স্থায়ী সহযোগিতা—যা ভবিষ্যতে শক্তির ভারসাম্য বদলে দিতে সক্ষম।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই চুক্তির ফলে ভারত-রাশিয়া প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্ব শুধু বাড়বেই না, বরং তা যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতেও একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর প্রস্তুতি নির্দেশ করে। গত কয়েক বছরে যেখানে বৈশ্বিক রাজনীতির হিসেব বদলেছে, সেখানে এই নয়া চুক্তি দুই দেশের বিশ্বাস ও বন্ধনকে আরও গভীর করে।
আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে ভারত-রাশিয়ার এই অগ্রগতি ভারতের বহুমাত্রিক পররাষ্ট্রনীতির সঠিক প্রতিফলন। পুতিনের ভারত সফরের আগে এই নয়া সামরিক চুক্তি নিঃসন্দেহে জোগাচ্ছে নতুন আস্থা এবং দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্ট্র্যাটেজিক সহযোগিতার ভিত্তি আরও শক্ত করছে।







