বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতনের অভিযোগ ঘিরে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে কূটনৈতিক টানাপড়েন নতুন করে প্রকাশ্যে এল। ঢাকার অন্তর্বর্তী সরকার ভারতের উদ্বেগকে ‘বিভ্রান্তিকর, অতিরঞ্জিত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। একই সঙ্গে তরুণ নেতা ওসমান হাদির হত্যাকারীরা কোথায়—তা নিয়েও দু’দেশের মধ্যে পাল্টাপাল্টি বিবৃতি শুরু হয়েছে।
পটভূমি: উদ্বেগ ও পাল্টা জবাব
গত সপ্তাহে ওসমান হাদির মৃত্যুর পর বাংলাদেশের পরিস্থিতি ফের উত্তপ্ত হয়। সেই সময়েই ময়মনসিংহে দীপুচন্দ্র দাস নামে এক যুবককে পিটিয়ে খুন এবং দেহে আগুন ধরানোর অভিযোগ ওঠে। এই ঘটনার পর দ্বিতীয় বার সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ জানায় ভারত।
দিল্লির বক্তব্যের ৪৮ ঘণ্টা পর ঢাকার পাল্টা বিবৃতিতে অন্তর্বর্তী সরকারের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র এস এম মাহবুবুল আলম বলেন, ভারতের মন্তব্য বাস্তব পরিস্থিতির প্রতিফলন নয় এবং বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ঐতিহ্যকে ভুল ভাবে উপস্থাপন করছে।
দিল্লির অবস্থান কী?
ভারতের বিদেশ মন্ত্রক গত শুক্রবার জানায়, বাংলাদেশে হিন্দু, খ্রিস্টান ও বৌদ্ধ-সহ সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে চরমপন্থীদের আচরণ উদ্বেগজনক। ময়মনসিংহের হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানিয়ে দিল্লি দাবি করে, বিভিন্ন বেসরকারি সূত্রে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সংখ্যালঘুদের উপর ২,৯০০-র বেশি হিংসার ঘটনা ঘটেছে—যার মধ্যে হত্যা, অগ্নিসংযোগ ও জমিদখলের অভিযোগ রয়েছে। এগুলিকে শুধু রাজনৈতিক অশান্তি বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না বলেও জানানো হয়।
ঢাকা এই তথ্য মানতে চায়নি। তাদের দাবি, বিচ্ছিন্ন অপরাধকে পরিকল্পিত ভাবে ‘প্রাতিষ্ঠানিক নিপীড়ন’ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।
হাদি হত্যার তদন্ত: কার দাবি ঠিক?
রবিবার ঢাকার তরফে দাবি করা হয়, হাদি হত্যার দুই মূল অভিযুক্ত—ফয়সাল করিম ও আলমগীর শেখ—মেঘালয় হয়ে ভারতে পালিয়েছেন। ঢাকার অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এন এন মহম্মদ নজরুল ইসলাম বলেন, সীমান্তে মানব পাচারকারীদের সহায়তায় তারা অবৈধ ভাবে প্রবেশ করেছে।
কিন্তু এই দাবিকে ‘অসত্য’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে Meghalaya Police ও BSF। মেঘালয় পুলিশের এক শীর্ষ কর্তা জানান, বাংলাদেশ পুলিশের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনও তথ্য চাওয়া হয়নি এবং গারো পাহাড়ে কোনও গ্রেফতারও হয়নি। বিএসএফ (মেঘালয় ফ্রন্টিয়ার) প্রধান ওপি উপাধ্যায় বলেন, হালুয়াঘাট সীমান্ত দিয়ে অভিযুক্তদের ভারতে ঢোকার কোনও প্রমাণ নেই।
ঢাকার উপর চাপ ও প্রতিশ্রুতি
হাদি হত্যার তদন্তে ঢাকার উপর চাপ বাড়ছে। হাদির সংগঠন ইনকিলাব মঞ্চ টানা আন্দোলনে রয়েছে। এই প্রেক্ষিতে অন্তর্বর্তী সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী আশ্বাস দেন, বর্তমান সরকারের মেয়াদেই বিচার সম্পন্ন হবে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন।
নির্বাচনের অঙ্ক: জামাত–এনসিপি জোট
এদিকে নির্বাচনী রাজনীতিতেও বড় খবর। জামায়েতে ইসলামি-র সঙ্গে জোটের ঘোষণা করেছে নতুন দল এনসিপি। তবে এই সমঝোতা ঘিরে এনসিপির অন্দরে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। নীতিগত আপত্তি জানিয়ে দুই শীর্ষ নেত্রী দল ছেড়েছেন এবং একাংশ নেতৃত্ব স্মারকলিপি দিয়েছে।
সংখ্যালঘু নিরাপত্তা, সীমান্ত তথ্য ও রাজনৈতিক সমঝোতা—সব মিলিয়ে ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্কে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। তদন্ত ও কূটনৈতিক সংলাপের পরবর্তী পদক্ষেপই নির্ধারণ করবে পরিস্থিতির দিশা।



