আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাসিনার রায়দান ঘোষণার কিছু ঘণ্টা আগে আবারও অডিয়োবার্তা দিয়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এলেন বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাঁর কণ্ঠে কোনও ভয়ের সুর নেই, বরং দৃঢ়তা। বললেন, রায় যা-ই আসুক, তিনি পরোয়া করেন না—“আল্লা জীবন দিয়েছেন, আল্লাই নেবেন।” বরং তাঁর দাবি, আওয়ামী লীগ আরও শক্তিশালী হয়ে বাংলাদেশের মাটিতে ফিরবে।
গত বছর জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর ক্ষমতা হারান শেখ হাসিনা। আন্দোলনের তীব্র সংঘর্ষে অন্তত দেড় হাজার মানুষের মৃত্যু হয় বলে অভিযোগ। ঠিক সেই সময়ই দেশ ছাড়তে বাধ্য হন তিনি, এবং এখনো ভারতে অবস্থান করছেন। এখান থেকেই মাঝে মধ্যেই তিনি দলের সমর্থকদের উদ্দেশে অডিয়োবার্তা পাঠান, যা পরে আওয়ামী লীগের সোশ্যাল মিডিয়া পেজে প্রকাশিত হয়।


আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের রায়ের আগের রাতেই হাসিনার নতুন বার্তা প্রকাশ্যে আসে। এতে তিনি ব্যঙ্গ ও তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেন বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস–কে। তাঁর অভিযোগ, ইউনূস স্বেচ্ছাচারী সিদ্ধান্ত নিয়ে নির্বাচিত সরকারকে অবৈধভাবে অপসারণ করেছেন এবং আন্দোলনের সময় বহু মানুষের মৃত্যুর জন্য তিনিই দায়ী।
‘আল্লা জীবন দিয়েছেন, তিনিই নেবেন’, রায়দানের আগে অডিয়োবার্তা শেখ হাসিনার
হাসিনার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি আন্দোলনকারীদের উপর গুলি চালানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু অডিয়োবার্তায় তা সরাসরি অস্বীকার করেছেন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী। দাবি করেছেন, পুলিশ কেবল রবার বুলেট ব্যবহার করেছিল, যা প্রাণঘাতী নয়। তাঁর কথায়, “মৃতদের পোস্টমর্টেম রিপোর্ট দেখলেই সত্য সামনে আসবে। কেন সাক্ষীদের জবানবন্দি প্রকাশ করা হয়নি?” এই প্রশ্ন তুলে তিনি বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।

শুধু তাই নয়, ইউনূস সরকারের বিরুদ্ধে তিনি পাল্টা অভিযোগ তোলেন—“গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারকে সরানোই আসল অপরাধ। এর দায় তো ইউনূসের।” তাঁর দাবি, বর্তমান প্রশাসন আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করতে চাইছে, তবে এটি কোনও দিনই সম্ভব হবে না, কারণ দলটি সাধারণ মানুষের শক্তি থেকে উঠে এসেছে।


আওয়ামী লীগের প্রতি তাঁর সমর্থন এবং ভবিষ্যৎ প্রত্যাবর্তনের জোরালো ইঙ্গিত দিয়েছেন হাসিনা। বলেছেন, “আমি বেঁচে আছি। বেঁচে থাকব। আবার মানুষের হিতার্থেই কাজ করব। বাংলাদেশের মাটির প্রতি সুবিচার করবই।” সমর্থকদের উদ্দেশে তাঁর এই বার্তা রায়ের আগে রাজনৈতিক উত্তেজনাকে আরও উস্কে দিয়েছে।
এদিকে, হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের সম্ভাবনা নিয়ে তাঁর পুত্র সাজীব ওয়াজেদ জয়ও আমেরিকা থেকে মন্তব্য করেছেন। তাঁর বক্তব্য, মৃত্যুদণ্ড ঘোষণার সম্ভাবনা রয়েছে, কিন্তু তাঁর মা ভারতে নিরাপদ আছেন এবং ভারত সরকার তাঁর পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে।
হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের যে মামলা চলছে, তার অন্যতম সাক্ষী বাংলাদেশের প্রাক্তন পুলিশ কর্তা আল-মামুন, যিনি রাজসাক্ষী হয়েছেন। ট্রাইব্যুনালে সরকার পক্ষ তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক প্রমাণ উপস্থাপন করেছে। আওয়ামী লীগ সমর্থকদের অনুমান, আদালত তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করতে পারে, হয়তো মৃত্যুদণ্ডও হতে পারে।
কিন্তু হাসিনা বার্তায় আবারও স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন—তিনি ভয় পান না। তাঁর কথায়, “ওরা রায় দিক, আমি পরোয়া করি না। আল্লা আমাকে জীবন দিয়েছেন, আল্লাই নেবেন। আমি মানুষের জন্য কাজ করা বন্ধ করব না।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই অডিয়োবার্তা রায়ের আগে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাতাবরণকে আরও উত্তেজিত করেছে এবং সমর্থকদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা যোগ করেছে। এখন চূড়ান্তভাবে অপেক্ষা আদালতের রায়ের।








