বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল মানবতাবিরোধী অপরাধে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। হিংসায় উস্কানি, হত্যার নির্দেশ এবং নিরাপত্তা বাহিনীকে নিষ্ক্রিয় করে রাখার অভিযোগে তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। এই রায়ের পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠে এসেছে—ভারত কি এখন হাসিনাকে প্রত্যর্পণ করতে বাধ্য? বর্তমানে হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন, ফলে ইস্যুটি দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে নতুন উত্তাপ যোগ করেছে।
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল জানিয়েছেন, হাসিনাকে ফেরানোর জন্য আবারও ভারতের কাছে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানো হবে। তাঁর কথায়, বিচারপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে ভারতের সহযোগিতা জরুরি। তবে নয়াদিল্লি এখনও এ বিষয়ে কোনও সিদ্ধান্ত জানায়নি।
ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে ২০১৩ সাল থেকে একটি বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি কার্যকর। সেই চুক্তি অনুযায়ী আদালতের রায়ে শাস্তিযোগ্য অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে এক দেশ অপর দেশের হাতে তুলে দিতে পারে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ একটি ‘ভার্বাল নোট’ পাঠিয়ে আনুষ্ঠানিক ভাবে হাসিনাকে ফেরত চেয়েছিল। ভারত তার গ্রহণযোগ্যতা নথিভুক্ত করলেও, তৎক্ষণাৎ কোনও মন্তব্য করেনি।
পররাষ্ট্র মন্ত্রকের বক্তব্য ছিল, চিঠির বৈধতা যাচাই প্রয়োজন। কারণ কোনও অন্তর্বর্তী সরকার—যা গণভোটে নির্বাচিত নয়—অন্য দেশের নির্বাচিত সরকারের কাছে রাজনৈতিক নেতার প্রত্যর্পণ চাইলে সেটি আইনগতভাবে সংবেদনশীল বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
ভারতের বিদেশসচিব বিক্রম মিস্রী সম্প্রতি জানিয়েছেন, হাসিনাকে প্রত্যর্পণ করার প্রশ্নটি সম্পূর্ণ বিচার বিভাগীয় এবং আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যেই সমাধান হবে। তাঁর কথায়, দুই দেশের মধ্যে বিস্তারিত আলোচনা প্রয়োজন, কারণ বিষয়টি কেবল কূটনৈতিক নয়—সংযুক্ত রয়েছে মানবাধিকার, নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক আইন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারতের হাতে আইনি ছাড়পত্র রয়েছে।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক অনিন্দ্যজ্যোতি মজুমদার মনে করেন, ভারত কোনওভাবেই বাধ্য নয় হাসিনাকে ফেরাতে। তাঁর মতে, প্রত্যর্পণ চুক্তিতে এমন কিছু শর্ত আছে, যেগুলি প্রয়োগ করলে ভারত আইনত তাঁকে ফেরত দিতে অস্বীকার করতে পারে।
অধ্যাপক ইমনকল্যাণ লাহিড়ীও একই মত প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, কোনও মামলার পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকলে প্রত্যর্পণের প্রশ্নই ওঠে না। রায়ের পর হাসিনার প্রাণহানির সম্ভাবনা থাকলে ভারত আরও দৃঢ় ভিত্তিতে প্রত্যর্পণ প্রত্যাখ্যান করতে পারে।
রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সব্যসাচী বসু রায়চৌধুরী জানান, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অভিযুক্তের ক্ষেত্রে ঝুঁকি থাকলে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুসারে ভারত তাঁকে ফেরত পাঠাতে বাধ্য নয়। এই বিষয়টি দুই দেশের চুক্তিতেও স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে।
কলকাতা হাই কোর্টের আইনজীবী অরিন্দম দাস বলেন, হাসিনা চাইলে রায়ের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করতে পারেন। কিন্তু দেশের বাইরে থাকার কারণে যদি তিনি সেই অধিকার প্রয়োগ করতে না পারেন, তা হলে সেটি মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তিনি আরও জানান, ট্রাইবুনালের রায়ের কপি ভারতকে পাঠানো হলেও তা মানা বাধ্যতামূলক নয়, কারণ প্রত্যর্পণের সময় মানবাধিকার ঝুঁকি একটি প্রধান বিবেচ্য বিষয়।
২০১৩ সালের প্রত্যর্পণ চুক্তিতে স্পষ্ট বলা ছিল, ন্যূনতম এক বছরের কারাদণ্ডযোগ্য অপরাধের ক্ষেত্রেই প্রত্যর্পণ কার্যকর হবে এবং অপরাধটি উভয় দেশেই শাস্তিযোগ্য হতে হবে। ২০১৬ সালের সংশোধনীতে শর্ত আরও সহজ করে জানানো হয়েছিল—গ্রেফতারি পরোয়ানা থাকলেই প্রত্যর্পণ সম্ভব। হাসিনার বিরুদ্ধেও একাধিক মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি রয়েছে, তাই বাংলাদেশ সেই ধারাই প্রয়োগ করছে।
কিন্তু একই চুক্তিতে উল্লেখ রয়েছে—অপরাধ যদি রাজনৈতিক চরিত্রের হয়, তবে প্রত্যর্পণ করা যাবে না। পাশাপাশি বিচার প্রক্রিয়া রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বা অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে পরিচালিত হলে ভারত প্রত্যর্পণ নাকচ করতে পারে। হাসিনা নিজেও বহুবার দাবি করেছেন, তাঁর বিরুদ্ধে মামলা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ফল।
২০১৩ সালের এই চুক্তি মূলত দুই দেশের সীমান্তে পালিয়ে থাকা উগ্রপন্থী ও অপরাধীদের সনাক্ত করতে তৈরি হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে এটি রাজনৈতিক এবং কূটনৈতিক পরিসরে entirely নতুন মাত্রা পেয়েছে।
২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের জেরে হাসিনার সরকার পতনের পর তিনি ভারতে আশ্রয় নেন। তারপর থেকেই প্রত্যর্পণ প্রশ্নটি দুই দেশেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
সব মিলিয়ে, ভারত আইনি ভাবে বাধ্য নয় হাসিনাকে ফেরাতে।
এখন নজর থাকবে—পরবর্তী কূটনৈতিক আলোচনায় নয়াদিল্লি কোন পথ বেছে নেয়।







