এবারও আশাভঙ্গ হল এসএসসি চাকরিপ্রার্থীদের একাংশের। ‘ভাল পড়ুয়া হলে আবার চাকরি পাবেন’—এই কথাই ভরসা হিসেবে রেখে ২৬ হাজার নিয়োগ বাতিলের রায় পুনর্বিবেচনার আর্জি জানানো হয়েছিল সুপ্রিম কোর্টে। কিন্তু প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর ডিভিশন বেঞ্চ সেই আর্জি গ্রহণ করল না। জানিয়ে দিল, আগে যে রায় দেওয়া হয়েছিল, অর্থাৎ ২০১৬–র সম্পূর্ণ প্যানেল বাতিল এবং নতুন করে নিয়োগের নির্দেশ, সেটাই বহাল থাকছে।
আদালতে স্পষ্ট বলা হয়েছে, ভাল পড়ুয়া হলে আবার চাকরি পাবেন, তাই কেবল এই যুক্তিতে পুরনো প্যানেল বাঁচানো সম্ভব নয়। শীর্ষ আদালতের মতে, নিয়োগ প্রক্রিয়ার গোড়াতেই যখন দুর্নীতি প্রমাণিত হয়েছে, তখন সেই প্যানেল টিকিয়ে রাখা সংবিধানের ন্যায়বিচারের ধারণার বিরোধী হবে।
২০১৬ সালের প্রাথমিকে এসএসসি–র সম্পূর্ণ প্যানেল বাতিল করে সুপ্রিম কোর্ট আগেই জানিয়েছিল, প্রায় ২৬ হাজার শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীর চাকরি খারিজ হবে। কমিশনকে নতুন করে নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি জারি করে, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া শেষ করতে বলা হয়েছিল। পাশাপাশি স্পষ্ট নির্দেশ ছিল, যাঁরা ‘দাগি’ বা টেন্টেড প্রার্থী, তাঁদের কোনওভাবেই ফের চাকরি দেওয়া যাবে না। এমনকী অতীতে পাওয়া বেতনও ফেরত দিতে হবে তাঁদের।
এই সিদ্ধান্তের পর অনেকেই দাবি করেছিলেন, এই প্যানেলে অনেক ভাল পড়ুয়া প্রার্থীও ছিলেন, যাঁরা কোনও দুর্নীতিতে জড়িত নন। তাঁদের চাকরি চলে যাওয়া অন্যায়। সেই যুক্তি নিয়েই পুনর্বিবেচনার আর্জি জানানো হয় সুপ্রিম কোর্টে। কিন্তু আদালত সে কথা আংশিক স্বীকার করলেও নিজের অবস্থান পরিবর্তন করল না। বেঞ্চের বক্তব্য, কোনও পরীক্ষার পুরো প্রক্রিয়া বাতিল হলে স্বাভাবিকভাবেই ভাল পড়ুয়ারাও ক্ষতিগ্রস্ত হন, কিন্তু ভাল পড়ুয়া হলে আবার চাকরি পাবেন, নতুন পরীক্ষাতেই তাঁরা নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করতে পারবেন।
নতুন নিয়োগপ্রক্রিয়া ইতিমধ্যেই শুরু করেছে স্কুল সার্ভিস কমিশন। নতুন করে পরীক্ষা নেওয়া হয়ে গিয়েছে, প্রকাশিত হয়েছে নতুন মেধাতালিকা। এই নিয়োগও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে একাংশ চাকরিপ্রার্থী আবার সুপ্রিম কোর্টে যান। তাঁদের অভিযোগ, নতুন নিয়োগেও বহু যোগ্য প্রার্থী বঞ্চিত হয়েছেন, অনেকের নামই তালিকায় নেই। তাঁদের দাবি ছিল, ২৬ হাজার নিয়োগ বাতিলের রায় পুনর্বিবেচনা করা হোক, অন্তত নতুন প্রক্রিয়াটি আপাতত স্থগিত থাকুক।
কিন্তু ডিভিশন বেঞ্চ স্পষ্ট জানিয়েছে, নতুন নিয়োগপ্রক্রিয়ায় তারা হস্তক্ষেপ করতে চায় না। বরং আদালতের মত, দুর্নীতিমুক্ত ও স্বচ্ছ নিয়োগ নিশ্চিত করতে গেলে পুরনো প্যানেল বাতিল ছাড়া বিকল্প ছিল না। তাই ভাল পড়ুয়া হলে আবার চাকরি পাবেন—এই নীতিতেই অটল থেকে বেঞ্চ আবেদন খারিজ করে দেয়।
এর আগেও এসএসসি–র নিয়োগ নিয়ে একাধিক মামলা সুপ্রিম কোর্টে যেতে দেখা গিয়েছে। ২৬ নভেম্বর শীর্ষ আদালত বেশির ভাগ মামলা কলকাতা হাই কোর্টে ফিরিয়ে দেয়। জানিয়ে দেয়, এসএসসি কোনওভাবেই এক জন ‘দাগি’ প্রার্থীকেও চাকরি দিতে পারবে না। অভিযোগ উঠেছিল, নতুন নিয়োগপ্রক্রিয়ায় প্রতিবন্ধী দাগি প্রার্থীদের সুযোগ দেওয়ার চেষ্টা করছে কমিশন। হাই কোর্ট সেই দাবি আগেই খারিজ করেছিল। পরে সুপ্রিম কোর্টও একই অবস্থান নেয়।
এবারের রায়ে শীর্ষ আদালত আরও একবার জানিয়ে দিল, এসএসসি–র নিয়োগ সংক্রান্ত বাকি সব মামলা হাই কোর্টেই চলবে। সুপ্রিম কোর্ট আপাতত আর এ ধরনের মামলা শুনবে না। তবে হাই কোর্টের সিদ্ধান্তে আইনি সমস্যা থাকলে তখনই কেবল শীর্ষ আদালতে আসা যাবে।
ফলে, ২৬ হাজার নিয়োগ বাতিলের রায় বদলানোর আশা কার্যত শেষ। চাকরি হারানো বহু প্রার্থীর সামনে একমাত্র পথ, নতুন পরীক্ষায় ভাল ফল করার চেষ্টা। সুপ্রিম কোর্টের ভাষায়, ভাল পড়ুয়া হলে আবার চাকরি পাবেন—কিন্তু তার জন্য লড়াই জিততে হবে একেবারে শুরু থেকে।







