ভারতের মহাকাশযাত্রায় নতুন ইতিহাস তৈরির প্রস্তুতি প্রায় শেষ। গগনযান অভিযানের প্রথম চালকহীন মিশন আগামী চার মাসের মধ্যেই মহাকাশে পাঠানোর লক্ষ্যে এগোচ্ছে ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরো (ISRO)। আহমেদাবাদে জাতীয় মহাকাশ দিবসের অনুষ্ঠানে সংস্থার চেয়ারম্যান ডঃ ভি নারায়ণন জানিয়েছেন, মানব মহাকাশযাত্রার আগে একাধিক চালকহীন পরীক্ষার মাধ্যমে প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা যাচাই করা হবে।
গগনযান শুধু ভারতের আর একটি মহাকাশ অভিযান নয়, দেশের নিজস্ব প্রযুক্তিতে মানুষকে মহাকাশে পাঠানোর দীর্ঘদিনের স্বপ্নের অন্যতম বড় পরীক্ষা। সেই লক্ষ্যে ইতিমধ্যেই ৮ হাজারের বেশি ছোট-বড় পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে বলে জানিয়েছেন ইসরো চেয়ারম্যান। চূড়ান্ত মানব অভিযানের আগে অন্তত তিনটি চালকহীন মিশন সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে।
২০১৮ সালের ১৫ আগস্ট লালকেল্লা থেকে স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী প্রথম ভারতীয় মহাকাশচারীকে নিজস্ব মহাকাশযানে মহাকাশে পাঠানোর লক্ষ্য ঘোষণা করেছিলেন। সেই ঘোষণার পর থেকেই গগনযান প্রকল্পকে সফল করতে একাধিক প্রযুক্তিগত পরীক্ষা চালিয়ে আসছেন ইসরোর বিজ্ঞানীরা।
ডঃ ভি নারায়ণনের বক্তব্য অনুযায়ী, গগনযানের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু মহাকাশে পৌঁছনো নয়, মহাকাশচারীদের সম্পূর্ণ নিরাপদে সেখানে পাঠানো এবং নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনা। সেই কারণেই মানব অভিযানের আগে চালকহীন মিশনের মাধ্যমে প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ খুঁটিয়ে পরীক্ষা করা হচ্ছে।
আগামী চার মাসের মধ্যে যে চালকহীন রকেটটি মহাকাশে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে, সেখানে কোনও মহাকাশচারী থাকবেন না। পরিবর্তে হিউম্যান-রেটেড রকেট এবং ক্রু মডিউলের কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হবে। উৎক্ষেপণের পর মহাকাশে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে মডিউলটি কী ভাবে কাজ করে, সেটিই হবে পরীক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
বিশেষ করে ক্রু মডিউলের ভিতরে জীবনধারণের উপযোগী পরিবেশ বজায় রাখা, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা ঠিক ভাবে কাজ করা এবং পৃথিবীতে নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের জন্য প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা কার্যকর রয়েছে কি না, তা যাচাই করা হবে। মানব অভিযানের আগে এই পরীক্ষাগুলির ফলাফল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে ইসরো।
গগনযানের প্রস্তুতির পাশাপাশি চলতি অর্থবর্ষেও ভারতের মহাকাশ কর্মসূচিতে ব্যস্ততা বাড়ছে। ইসরোর পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই সময়ের মধ্যে আটটি রকেট উৎক্ষেপণের পাশাপাশি ১২টি স্যাটেলাইট মহাকাশে পাঠানোর লক্ষ্য রয়েছে। অর্থাৎ মানব মহাকাশযাত্রার প্রস্তুতির পাশাপাশি নিয়মিত মহাকাশ পরিষেবার কাজও এগিয়ে চলবে।
এই স্যাটেলাইটগুলির মাধ্যমে যোগাযোগ ব্যবস্থা, নেভিগেশন এবং পৃথিবীর আবহাওয়া পর্যবেক্ষণের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে তথ্য সংগ্রহ ও পরিষেবা আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে গগনযানের প্রস্তুতির পাশাপাশি ভারতের সামগ্রিক মহাকাশ পরিকাঠামোও সমান্তরাল ভাবে সম্প্রসারিত হচ্ছে।
মহাকাশ গবেষণায় কেন্দ্রীয় সরকারের সাম্প্রতিক সংস্কার নিয়েও ইতিবাচক মত জানিয়েছেন ইসরো চেয়ারম্যান। তাঁর বক্তব্য, বর্তমান সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ভারতের মহাকাশ ক্ষেত্রকে এগিয়ে নিয়ে যেতে এই পরিবর্তন প্রয়োজন ছিল। বিশেষ করে বেসরকারি সংস্থাগুলির অংশগ্রহণ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছেন তিনি।
ডঃ নারায়ণনের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ৬৪ বছরে ভারত ৫৬টি স্পেস অ্যাসেট তৈরি করতে পেরেছে। কিন্তু আগামী পাঁচ বছরে দেশের প্রয়োজন হতে পারে ২০০ থেকে ৩০০টি নতুন স্যাটেলাইট। এই বিশাল চাহিদা পূরণ করতে শুধু সরকারি পরিকাঠামোর উপর নির্ভর না করে বেসরকারি ক্ষেত্রকেও সক্রিয় ভাবে যুক্ত করা জরুরি বলে মনে করছেন তিনি।
তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, ভারতের মহাকাশ কর্মসূচি এখন আর শুধু সরকারি গবেষণাকেন্দ্রিক প্রকল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। যোগাযোগ, নেভিগেশন, আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ থেকে শুরু করে মানব মহাকাশযাত্রা—বিভিন্ন ক্ষেত্রে একসঙ্গে সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়েই এগোচ্ছে দেশ।
গগনযানের প্রথম চালকহীন মিশন তাই ভারতের মানব মহাকাশযাত্রার পথে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হতে চলেছে। আগামী চার মাসের পরীক্ষায় রকেট ও ক্রু মডিউলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা সফল ভাবে কাজ করে, তার উপরই পরবর্তী ধাপের প্রস্তুতি অনেকটাই নির্ভর করবে। ইসরোর দাবি অনুযায়ী, হাজার হাজার পরীক্ষা ও দীর্ঘ প্রস্তুতির পর ভারত এখন সত্যিই গগনযানের চূড়ান্ত পর্বের দোরগোড়ায়।



