স্টারলিঙ্কের ভারতে প্রবেশে কারা বাধা দিচ্ছে? নাম না করে ‘অলিগার্ক’দের নিশানা মাস্কের, পাল্টা কেন্দ্র

ভারতে স্টারলিঙ্কের বাণিজ্যিক পরিষেবা চালু নিয়ে মুখ খুললেন ইলন মাস্ক। কিছু ‘অলিগার্ক’ বাধা দিচ্ছেন বলে অভিযোগ তাঁর, তবে সেই দাবি সরাসরি খারিজ করেছে কেন্দ্র।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

ভারতে স্টারলিঙ্কের (Starlink) বাণিজ্যিক পরিষেবা চালুর পথে কারা বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে, তা নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তুললেন ইলন মাস্ক (Elon Musk)। বুধবার এক্স (X)-এ পোস্ট করে স্পেসএক্সের কর্ণধার অভিযোগ করেন, কিছু ‘অলিগার্ক’ নিজেদের একচেটিয়া ব্যবসায়িক প্রভাব বজায় রাখতে স্টারলিঙ্কের ভারতে প্রবেশ আটকে দিচ্ছেন। তবে মাস্কের অভিযোগের পরই বৃহস্পতিবার কেন্দ্রের তরফে তা খারিজ করে দেওয়া হয়েছে।

মাস্ক কোনও ব্যক্তি বা সংস্থার নাম করেননি। তাঁর দাবি, এই প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলি ভারতীয় গ্রাহকদের উপর নিজেদের ‘monopolistic chokehold’ বজায় রাখতেই স্টারলিঙ্কের পরিষেবা চালু হতে দিচ্ছে না। বিষয়টিকে ‘ভারতের মানুষের বিরুদ্ধে অপরাধ’ বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।

মাস্কের এই মন্তব্য এমন সময়ে এল, যখন ভারতে পরিষেবা চালুর জন্য প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো তৈরির কাজ প্রায় শেষ করে ফেলেছে স্টারলিঙ্ক। ২০টি গেটওয়ে সাইট এবং কয়েকশো অ্যান্টেনা ইতিমধ্যেই তৈরি রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংস্থার ভাইস প্রেসিডেন্ট লরেন ড্রেয়ার (Lauren Dreyer)। ভারতীয় ব্যবহারকারীদের তথ্য দেশের মধ্যেই রাখার ব্যবস্থাও করা হয়েছে বলে সংস্থার দাবি।

বুধবার ইন্ডিয়া মোবাইল কংগ্রেসে (India Mobile Congress) বক্তব্য রাখতে গিয়ে ড্রেয়ার জানান, ভারতীয় নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রক কাঠামোর কথা মাথায় রেখেই এ দেশে স্টারলিঙ্কের পরিকাঠামো তৈরি করা হয়েছে। গত পাঁচ বছর ধরে ভারতীয় নিয়ন্ত্রক, টেলিকম সংস্থা ও শিল্পক্ষেত্রের সঙ্গে কাজ করার কথাও জানান তিনি।

স্টারলিঙ্কের হাতে ভারতে স্যাটেলাইট যোগাযোগ পরিষেবা দেওয়ার প্রয়োজনীয় একটি গুরুত্বপূর্ণ লাইসেন্স ইতিমধ্যেই রয়েছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে সংসদে কেন্দ্র জানিয়েছিল, ডিপার্টমেন্ট অফ টেলিকমিউনিকেশনস (Department of Telecommunications) স্টারলিঙ্ককে GMPCS পরিষেবার জন্য ইউনিফায়েড লাইসেন্স দিয়েছে। একই সঙ্গে OneWeb India এবং Jio Satellite Communications-কেও এই অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

কিন্তু লাইসেন্স পাওয়া মানেই এখনও ভারতে বাণিজ্যিক পরিষেবা চালু করার সবুজ সংকেত পাওয়া নয়। স্টারলিঙ্কের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত নিরাপত্তা ছাড়পত্র এবং বিদেশি বিনিয়োগ সংক্রান্ত অনুমোদনের মতো বিষয় এখনও বাকি রয়েছে বলে সাম্প্রতিক রিপোর্টে জানানো হয়েছে। পাশাপাশি স্যাটেলাইট স্পেকট্রাম ব্যবহারের বিষয়টিও পরিষেবা চালুর গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

ভারতে স্যাটেলাইট যোগাযোগ পরিষেবার স্পেকট্রাম কীভাবে বরাদ্দ হবে, তা নিয়ে টেলিকম রেগুলেটরি অথরিটি অফ ইন্ডিয়া (Telecom Regulatory Authority of India)-ও ২০২৬ সালে পরামর্শ প্রক্রিয়া চালিয়েছে। অর্থাৎ, স্টারলিঙ্কের বাণিজ্যিক পরিষেবা চালুর প্রশ্নটি শুধু কোনও একটি সংস্থার অনুমোদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে স্পেকট্রাম, নিরাপত্তা এবং নিয়ন্ত্রক কাঠামোর একাধিক বিষয় জড়িত।

এই জায়গাতেই মাস্কের অভিযোগ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তিনি যে ‘অলিগার্ক’-দের কথা বলেছেন, তাঁদের নাম প্রকাশ করেননি এবং তাঁর দাবির পক্ষে কোনও নির্দিষ্ট প্রমাণও প্রকাশ্যে দেননি। ফলে কোন ব্যক্তি বা সংস্থাকে তিনি ইঙ্গিত করেছেন, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।

বরং বৃহস্পতিবার কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে মাস্কের অভিযোগ সরাসরি নাকচ করা হয়েছে। সরকারের বক্তব্য, স্যাটেলাইট যোগাযোগ পরিষেবার অনুমোদন প্রক্রিয়ায় কোনও পক্ষপাত নেই এবং দেশি-বিদেশি সমস্ত অপারেটরের ক্ষেত্রেই একই ধরনের নিরাপত্তা যাচাই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়। মাস্কের অভিযোগকে ‘baseless’ এবং ‘misconceived’ বলে খারিজ করেছে কেন্দ্র।

স্টারলিঙ্কের ভারতীয় বাজারে প্রবেশের গুরুত্ব অবশ্য যথেষ্ট। স্যাটেলাইট ইন্টারনেট এমন সব এলাকায় দ্রুত সংযোগ পৌঁছে দিতে পারে, যেখানে ফাইবার বা প্রচলিত টেলিকম পরিকাঠামো তৈরি করা কঠিন। বিশেষ করে প্রত্যন্ত গ্রাম, দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল কিংবা দুর্যোগের সময়ে বিকল্প যোগাযোগ ব্যবস্থা হিসেবে এই প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে ইতিমধ্যেই আলোচনা রয়েছে।

অন্যদিকে, ভারতের বাজারে স্টারলিঙ্ক ঢুকলে তাকে দেশীয় টেলিকম ও অন্যান্য স্যাটেলাইট পরিষেবা সংস্থার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামতে হবে। Reliance Jio-র স্যাটেলাইট পরিষেবা এবং Eutelsat OneWeb-ও এই বাজারে রয়েছে। Amazon-এর Kuiper-ও ভারতের বাজারে প্রবেশের প্রক্রিয়ায় রয়েছে বলে সাম্প্রতিক রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।

ফলে মাস্কের ‘অলিগার্ক’ অভিযোগ এখন শুধু স্টারলিঙ্কের বাণিজ্যিক প্রবেশের প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে ভারতের স্যাটেলাইট ইন্টারনেট বাজারে প্রতিযোগিতা, নিরাপত্তা ছাড়পত্র এবং স্পেকট্রাম নীতির বিষয়ও জড়িয়ে পড়েছে। তবে অভিযোগের জবাবে কেন্দ্র যে অবস্থান নিয়েছে, তাতে আপাতত স্পষ্ট—সরকার স্টারলিঙ্ককে কোনও বিশেষভাবে আটকে রাখার অভিযোগ মানছে না।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন