২২ বছরের অপেক্ষার অবসান। রবিবার যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে ডুরান্ড কাপ ফাইনালে কলকাতা ডার্বির মঞ্চে একতরফা দাপট দেখাল ইস্টবেঙ্গল। এডমুন্ডের দুরন্ত হ্যাটট্রিক এবং বিপিন সিংহের গোলে মোহনবাগানকে ৪-১ ব্যবধানে উড়িয়ে দিয়ে ডুরান্ড কাপের ট্রফি ঘরে তুলল লাল-হলুদ। গ্রুপ পর্বে যে দলের কাছে হারতে হয়েছিল, ফাইনালে সেই মোহনবাগানকেই কার্যত অসহায় করে তুলল আন্তোনিয়ো লোপেজ় হাবাসের দল।
ফাইনালের আগে কাগজে-কলমে দুই দলের শক্তির ব্যবধান খুব বেশি ছিল না। কিন্তু মাঠে নামার পর ছবিটা বদলে গেল সম্পূর্ণ। ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণের ঝড় তুলল ইস্টবেঙ্গল। মাত্র ২২ মিনিটের মধ্যে তিন গোল করে ফাইনালের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে নেয় লাল-হলুদ।
এডমুন্ডের জোড়া গোলের পাশাপাশি বিপিন সিংহের গোলে দ্রুত ৩-০ এগিয়ে যায় ইস্টবেঙ্গল। কলকাতা ডার্বির মতো বড় ম্যাচে এত অল্প সময়ে তিন গোল হজম করে কার্যত ম্যাচ থেকে ছিটকে যায় মোহনবাগান। যদিও মনবীর সিংহ একক দক্ষতায় একটি গোল শোধ করেন, তাতে ম্যাচের গতিপথ বদলায়নি।
প্রথমার্ধ শেষ হওয়ার আগেই নিজের হ্যাটট্রিক সম্পূর্ণ করেন এডমুন্ড। ফলে বিরতির সময়ই ইস্টবেঙ্গলের সামনে ছিল ৪-১ ব্যবধান। দ্বিতীয়ার্ধে মোহনবাগান ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেও লাল-হলুদের রক্ষণ ও মাঝমাঠের সংগঠিত ফুটবলের সামনে সেই চেষ্টা সফল হয়নি।
এই জয় শুধু একটি ডার্বি জয়ের মধ্যে আটকে থাকছে না। ২২ বছর পর ডুরান্ড কাপের ট্রফি হাতে তুলল ইস্টবেঙ্গল। ফলে দীর্ঘ অপেক্ষার অবসানের পাশাপাশি সমর্থকদের কাছে এই জয় আরও বিশেষ হয়ে উঠল কলকাতা ডার্বির মঞ্চে মোহনবাগানকে বড় ব্যবধানে হারানোর কারণে।
এই জয়ের নেপথ্যে সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব অবশ্যই আন্তোনিয়ো লোপেজ় হাবাসের। একসময় মোহনবাগানের কোচ হিসেবে ইস্টবেঙ্গলের বিরুদ্ধে একাধিক সাফল্য পেয়েছেন তিনি। এ বার দায়িত্ব বদলে লাল-হলুদ শিবিরের কোচ হয়ে পুরনো দলের বিরুদ্ধেই বড় মঞ্চে কৌশলের লড়াইয়ে জয় পেলেন হাবাস।
বিশেষ করে মোহনবাগানের রক্ষণকে যেভাবে নিশানা করল ইস্টবেঙ্গল, তাতে হাবাসের ম্যাচ পরিকল্পনা স্পষ্ট হয়ে যায়। শুরু থেকেই আক্রমণের গতি বাড়িয়ে সবুজ-মেরুন ডিফেন্সকে চাপে রাখা হয়। একের পর এক জায়গা তৈরি করে সেখান দিয়েই আক্রমণ চালায় লাল-হলুদ।
উলটো দিকে মোহনবাগানের রক্ষণে এ দিন একাধিক দুর্বলতা চোখে পড়েছে। শিলংয়ে সেমিফাইনাল খেলা, বৃষ্টিভেজা কর্দমাক্ত মাঠে নামা এবং তার পরের যাত্রার ধকল অবশ্যই দলের ক্লান্তি বাড়িয়েছিল। কিন্তু ডুরান্ড কাপ ফাইনালের মতো বড় ম্যাচে সেই ক্লান্তি দিয়ে চার গোল হজমের ব্যাখ্যা দেওয়া কঠিন।
শুভাশিস বসু ও আলবের্তো রদ্রিগেজ়দের রক্ষণ বারবার ইস্টবেঙ্গলের গতির সামনে সমস্যায় পড়েছে। উপরে উঠে যাওয়ার পর দ্রুত নীচে ফিরতে না পারায় ফাঁকা জায়গা তৈরি হয়েছে। সেই জায়গাগুলিই কাজে লাগিয়েছে ইস্টবেঙ্গলের আক্রমণভাগ।
মোহনবাগানের মাঝমাঠও এ দিন প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। আপুইয়া এবং অনিরুদ্ধ থাপা ম্যাচে প্রভাব ফেলতে ব্যর্থ হন। আক্রমণভাগেও জেমি ম্যাকলারেন একাধিক সুযোগ পেয়েও কাজে লাগাতে পারেননি। মনবীরের পাস থেকে পাওয়া সহজ সুযোগ নষ্ট হওয়াও সবুজ-মেরুনের হতাশা আরও বাড়িয়েছে।
তবে ইস্টবেঙ্গলের পারফরম্যান্সকে শুধু মোহনবাগানের ব্যর্থতা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না। লাল-হলুদের মাঝমাঠে মহম্মদ রশিদের পারফরম্যান্স ছিল নজরকাড়া। বল নিয়ন্ত্রণ, পাসিং এবং প্রতিপক্ষের আক্রমণ ভেঙে দেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি ধারাবাহিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছেন।
রশিদের সঙ্গে ইস্টবেঙ্গলের বাকি ফুটবলারদের সমন্বয়ও ছিল চোখে পড়ার মতো। মাঝমাঠ থেকে আক্রমণভাগে দ্রুত বল পৌঁছেছে, আবার বল হারানোর পর মুহূর্তের মধ্যে চাপ তৈরি করেছে লাল-হলুদ। ফলে মোহনবাগান কোনও সময়ই স্বাভাবিক ছন্দে নিজেদের খেলা তৈরি করতে পারেনি।
সবচেয়ে বড় কথা, এ দিন ইস্টবেঙ্গলের ফুটবলারদের মধ্যে যে বাড়তি তাগিদ দেখা গিয়েছে, সেটাই ডার্বির পার্থক্য গড়ে দিয়েছে। ২২ বছর পর ডুরান্ড কাপ জয়ের লক্ষ্য নিয়ে নামা লাল-হলুদ শুরু থেকেই ম্যাচকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। আর এডমুন্ডের ঐতিহাসিক হ্যাটট্রিক সেই রাতকে চিরস্মরণীয় করে দিল।
যুবভারতীর গ্যালারি তাই শেষ বাঁশির সঙ্গে সঙ্গে রাঙল লাল-হলুদে। ৪-১ ব্যবধানে ডার্বি জয়, এডমুন্ডের হ্যাটট্রিক এবং ২২ বছর পর ডুরান্ড কাপ—ইস্টবেঙ্গল সমর্থকদের জন্য রবিবারের রাত নিঃসন্দেহে স্মরণীয় হয়ে রইল।



